রান্নার হাঁড়ি থেকেই খাবারে মিশছে সিসা, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ গবেষণা

রান্নাঘরের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল আমাদের খুব পরিচিত। এসব পাত্রে ভাত রান্না হয়, ডাল বসে, খিচুড়ি তৈরি হয়। অনেক পরিবারের কাছে এগুলো বেশ সাশ্রয়ীও। পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র ভাঙিয়ে নতুন পাত্র বানানোর চলও আছে। বাইরে থেকে চকচকে নতুন হাঁড়ি দেখলে কে বলবে, সেটি খাবারের জন...
রান্নাঘরের অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল আমাদের খুব পরিচিত। এসব পাত্রে ভাত রান্না হয়, ডাল বসে, খিচুড়ি তৈরি হয়। অনেক পরিবারের কাছে এগুলো বেশ সাশ্রয়ীও।
পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র ভাঙিয়ে নতুন পাত্র বানানোর চলও আছে। বাইরে থেকে চকচকে নতুন হাঁড়ি দেখলে কে বলবে, সেটি খাবারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ—আইসিডিডিআর,বি-এর এক যৌথ গবেষণায় এমনই উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
গবেষকেরা দেখেছেন, স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি স্থানীয় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে রান্নার সময় খাবারে সিসা মিশতে পারে। নতুন হাঁড়িতে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। আর স্টিলের তারের জালি দিয়ে হাঁড়ি মাজলে সিসা বেরিয়ে আসার পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
সিসা বা লেড একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু। এটি শরীরে জমতে পারে এবং বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে। সমস্যা হলো, সিসা মিশে যাওয়া খাবার দেখতে অন্য খাবারের মতোই।
এর কোনো আলাদা রং, গন্ধ বা স্বাদ নেই। তাই শুধু চোখে দেখে কিংবা খাবার খেয়ে বোঝার উপায় নেই, তাতে সিসা মিশেছে কি না। এই গবেষণার গুরুত্ব এখানেই।
আমরা সাধারণত খাবারের মান নিয়ে ভাবি, রান্নার আগে সবজি ভালোভাবে ধুয়ে নিই, পানি পরিষ্কার কি না তা খেয়াল করি। কিন্তু যে হাঁড়িতে খাবার রান্না হচ্ছে, সেটিও যে দূষণের উৎস হতে পারে, তা অনেকের ভাবনায় আসে না। আর এই বিষয়টিই এবার সামনে নিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানীরা।
সেই বিজ্ঞানীদের তালিকায় আছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানীরাও। .খাবারে ভারী ধাতুর রকমফের.সিসা বা লেড একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু। .দুইগবেষণাটি করেছেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআর,বি’র একদল গবেষক।
তাঁদের গবেষণাপত্রের নাম ‘টক্সিক কুকওয়্যার: লেড এক্সপোজার ফ্রম অ্যালুমিনিয়াম পটস ইন বাংলাদেশ’। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর এটি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি সাময়িকীতে। গবেষক দলের সদস্য ছিলেন রাফায়েল কিম, আলিরেজা নামায়ানদেহ, হান্নাহ ম্যাকগোরান, আলান্দ্রা লোপেজ, জেসমিন সুলতানা, মুসা বাকের, মাহবুবুর রহমান, স্টিফেন পি লুবি, স্কট ফেনডর্ফ ও জেনা ই ফোরসাইথ।
এই দলের বড় একটি অংশ স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও গবেষণাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশ থেকে গবেষণায় অংশ নিয়েছেন আইসিডিডিআর,বি’র পরিবেশ স্বাস্থ্য ও ওয়াশ বিভাগের গবেষকেরা। গবেষণাটির পরিকল্পনা, পরীক্ষার নকশা ও তত্ত্বাবধানে যুক্ত ছিলেন জেনা ফোরসাইথ।
তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রজেক্ট আনলেডেড’ কর্মসূচির পরিচালক। বাংলাদেশে সিসার সংস্পর্শের বিভিন্ন উৎস নিয়ে তাঁর দল আগে থেকেই কাজ করছে। গবেষকদের মূল প্রশ্ন ছিল, স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে কতটা সিসা আছে।
রান্নার সময় সেই সিসা খাবারে মিশে যায় কি না। আর হাঁড়ি নতুন না পুরোনো, খাবারের অম্লতা কিংবা হাঁড়ি পরিষ্কারের পদ্ধতির কারণে সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণ কতটা বদলায়। .খাবারে সোনা কি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ.বাংলাদেশ থেকে গবেষণায় অংশ নিয়েছেন আইসিডিডিআর,বি’র পরিবেশ স্বাস্থ্য ও ওয়াশ বিভাগের গবেষকেরা।
.বাংলাদেশে অনেক স্থানীয় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল তৈরি হয় পুরোনো ধাতু গলিয়ে। বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা স্ক্র্যাপ বা ফেলে দেওয়া ধাতু গলিয়ে নতুন পাত্র বানানো হয়। এসব ধাতুতে কী কী উপাদান আছে, তা ঠিকভাবে পরীক্ষা না করলে বিপজ্জনক পদার্থও নতুন পাত্রের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
সিসা তেমনই একটি উপাদান। সমস্যাটি বোঝার জন্য আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি মানেই যে তাতে সিসা আছে, এমন নয়।
গবেষণাটি মূলত স্ক্র্যাপ ধাতু ব্যবহার করে তৈরি স্থানীয় অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র নিয়ে। অর্থাৎ সব ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রকে এই গবেষণার ফলাফলের আওতায় ফেলা যাবে না। কোন কাঁচামাল দিয়ে পাত্র তৈরি হচ্ছে এবং উৎপাদনের সময় ধাতুর মান যাচাই করা হচ্ছে কি না, সেটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা পরীক্ষার জন্য স্থানীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকে ২০টি নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবারের ব্যবহার করা সাতটি পুরোনো হাঁড়িও নেন। প্রথমে পাত্রগুলোর ধাতুতে সিসার উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
এরপর সেগুলোতে খাবার রান্না করে দেখা হয়, কতটা সিসা খাবারে চলে আসে। পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হয় আমাদের সবার পরিচিত ভাত ও খিচুড়ি। কারণ শুধু কোনো তরল পদার্থে সিসা মিশছে কি না, তা পরীক্ষা করলেই বাস্তব রান্নার পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
কঠিন খাবার রান্নার সময়ও পাত্র থেকে ধাতু খাবারে যেতে পারে। তাই গবেষকেরা সরাসরি ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে সেগুলোর সিসার মাত্রা পরীক্ষা করেন। .বয়স বাড়লে খাবার আগের মতো মজা লাগে না কেন.পরীক্ষার জন্য বেছে নেওয়া হয় আমাদের সবার পরিচিত ভাত ও খিচুড়ি।
.তবে গবেষণাটি শুধু রান্নার পরীক্ষাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তরল খাবারের ক্ষেত্রে কী ঘটে, সেটিও বোঝার চেষ্টা করেন তাঁরা। এ জন্য ব্যবহার করা হয় ৪ শতাংশ অ্যাসিটিক অ্যাসিডের দ্রবণ।
অ্যাসিটিক অ্যাসিড হলো ভিনেগারের প্রধান অ্যাসিড। নির্দিষ্ট ঘনত্বের এই দ্রবণ দিয়ে খাবারের মতো তরল পরিবেশ তৈরি করে পরীক্ষা করা হয়, হাঁড়ি থেকে সিসা কতটা বেরিয়ে আসে। দ্রবণের অম্লতার মাত্রাও পরিবর্তন করা হয়।
এ ছাড়া হাঁড়ি কতবার ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও নেওয়া হয় বিবেচনায়। নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার ও পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের মধ্যে সিসা বেরিয়ে আসার পার্থক্য আছে কি না, তা দেখা হয়। হাঁড়ি ঘষে মাজলে কী হয়, আবার রান্নার সময় খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করলে সিসা বের হওয়ার পরিমাণ বাড়ে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়েছে।
এসব পরীক্ষায় খাবার ও তরল নমুনার সিসার মাত্রা নির্ণয়ে ব্যবহার করা হয় সংবেদনশীল পরীক্ষাগার পদ্ধতি। এভাবে গবেষকেরা শুধু হাঁড়িতে সিসা আছে কি না, তা-ই দেখেননি, রান্নার সময় সেই সিসা কীভাবে খাবারে মিশছে, কোন পরিস্থিতিতে বেশি মিশছে, সেটিও জানার চেষ্টা করেছেন। এসব পরীক্ষা থেকে কী জানলেন গবেষকেরা।
.মাটির প্লেটে খাবার খেলে স্বাদ অন্য রকম লাগে কেন.অ্যাসিটিক অ্যাসিড হলো ভিনেগারের প্রধান অ্যাসিড। .তিনপরীক্ষার ফল উদ্বেগজনক। নতুন ও পুরোনো উভয় হাঁড়ি থেকেই সিসা বেরিয়ে এসেছে।
তবে নতুন হাঁড়ির ক্ষেত্রে পরিমাণ ছিল বেশি। বিশেষ করে প্রথমবার রান্নার সময় সবচেয়ে বেশি সিসা খাবারে মিশেছে। নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার ভাত রান্না করার পর প্রতি কেজি ভাতে সিসার মাত্রা পাওয়া গেছে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম।
খিচুড়ির ক্ষেত্রে তা ছিল প্রতি কেজিতে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম। পরিমাণগুলো বুঝতে একটি তুলনা করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন শিশুখাদ্যের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম সিসার সীমা নির্ধারণ করেছে।
সেই তুলনায় নতুন হাঁড়িতে রান্না করা ভাতে পাওয়া সিসার মাত্রা এই সীমার প্রায় ৩০ গুণ। খিচুড়ির ক্ষেত্রে প্রায় ৪২ গুণ। শুধু প্রথমবার রান্নার সময়ই যে সিসা বেরিয়েছে, তা নয়।
কয়েকবার ব্যবহারের পরও খাবারে সিসা পাওয়া গেছে। তবে ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিমাণ কমেছে। গবেষকদের ধারণা, নতুন হাঁড়ির বাইরের পৃষ্ঠে এমন সিসা থাকে, যা তুলনামূলক সহজে খাবারে মিশে যেতে পারে।
বারবার ব্যবহারের ফলে পৃষ্ঠের ওই সিসার পরিমাণ কমে আসে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কয়েকবার ব্যবহার করলেই হাঁড়িটি নিরাপদ হয়ে যায়। পরীক্ষায় তৃতীয়বার ব্যবহারের পরও সিসার উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে।
পুরোনো হাঁড়ির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে। সাতটি পুরোনো হাঁড়ির মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতে পাওয়া গেছে সিসা। অর্থাৎ হাঁড়ি পুরোনো হলেই ঝুঁকি শেষ, এমনটা ভেবে খুশি হওয়ার কোনো উপায় নেই।
আবার নতুন হাঁড়ি চকচকে দেখালেও সেটিকে নিরাপদ বলা যাচ্ছে না। .অতি প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খেলে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে: গবেষণা.নতুন হাঁড়িতে প্রথমবার ভাত রান্না করার পর প্রতি কেজি ভাতে সিসার মাত্রা পাওয়া গেছে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম। .গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলগুলোর একটি হলো, হাঁড়ি পরিষ্কারের পদ্ধতির সঙ্গে সিসা বেরিয়ে আসার সম্পর্ক রয়েছে।
আমরা অনেকেই হাঁড়ি-পাতিল পরিষ্কার করতে স্টিলের তার দিয়ে তৈরি জালি ব্যবহার করি। বিশেষ করে হাঁড়ির গায়ে খাবার লেগে গেলে সেটি ঘষে পরিষ্কার করা হয়। কিন্তু গবেষকেরা দেখেছেন, নতুন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি স্টিলের তারের জালি দিয়ে ঘষে মাজলে সিসা বেরিয়ে আসার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
অ্যাসিডের দ্রবণ দিয়ে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, নতুন হাঁড়ি প্রথমবার ব্যবহারের সময় ঘষে মাজলে, না মাজা হাঁড়ির তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা বেরিয়ে আসে। দ্বিতীয়বার ব্যবহারের পরীক্ষাতেও ঘষে মাজা হাঁড়ি থেকে প্রায় তিন গুণ বেশি সিসা পাওয়া যায়। ধাতব জালি দিয়ে জোরে ঘষলে হাঁড়ির ওপরিভাগ ক্ষয় হতে পারে।
পৃষ্ঠে জমে থাকা সিসা তখন সহজে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়। গবেষকদের ফলাফলও বলছে, হাঁড়ির ওপরিভাগের ক্ষয় সিসা বেরিয়ে আসার পরিমাণ বাড়াতে পারে। রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়াচাড়া করলেও সিসা বেরিয়ে আসার পরিমাণ বেড়েছে।
অর্থাৎ শুধু হাঁড়ির ভেতরে কী রান্না হচ্ছে, সেটিই নয়; কীভাবে হাঁড়ি পরিষ্কার করছেন এবং রান্নার সময় কী ব্যবহার করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের অম্লতাও এখানে ভূমিকা রাখে। গবেষণায় অ্যাসিডিক দ্রবণের অম্লতার মাত্রা বদলে পরীক্ষা করা হয়েছিল।
ফলাফলে দেখা গেছে, অম্লতা বাড়লে সিসা বেরিয়ে আসার প্রবণতাও বাড়ে। অর্থাৎ টক বা বেশি অম্লধর্মী খাবার রান্নার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে গবেষণাটি দেখাচ্ছে, নতুন হাঁড়ি, অম্লধর্মী খাবার এবং জোরে ঘষে পাত্র পরিষ্কার করা হলে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
.প্লাস্টিকে খাবার মোড়ালে কি খাবারের ক্ষতি হয়.গবেষকদের ফলাফলও বলছে, হাঁড়ির ওপরিভাগের ক্ষয় সিসা বেরিয়ে আসার পরিমাণ বাড়াতে পারে। .চারএতটা যদি পড়ে থাকেন, তাহলে এতক্ষণে বুঝে গেছেন, অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র থেকে আমাদের দেহে সিসা আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শরীরে সিসা ঢুকলে কী ক্ষতি হয়।
সিসা শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো উপাদান নয়। খাবার, পানি, ধুলাবালি কিংবা অন্য কোনো উৎস থেকে সিসা শরীরে ঢুকতে পারে। একবার শরীরে প্রবেশ করলে এর একটি অংশ রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
মস্তিষ্ক, যকৃৎ ও কিডনিতে পৌঁছাতে পারে। আবার হাড় ও দাঁতে জমেও থাকতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে শরীরে সিসা ঢুকলে তার প্রভাব আরও গুরুতর হয়।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য সিসা খুব বিপজ্জনক। শিশুদের মস্তিষ্ক তখনো বিকশিত হচ্ছে। এই সময়ে সিসার সংস্পর্শে এলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।
এতে বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা কমে যেতে পারে, শেখার সমস্যা তৈরি হতে পারে, অসুবিধা হতে পারে মনোযোগ ধরে রাখতে। আচরণেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। সমস্যা হলো, অল্প মাত্রার সিসার সংস্পর্শে এসেও শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, অথচ বাইরে থেকে সব সময় তা বোঝা যায় না।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা দেয় না স্পষ্ট কোনো উপসর্গ। ফলে পরিবার বুঝতেই পারে না, শিশুটি ধীরে ধীরে সিসার সংস্পর্শে আসছে। .মেঝেতে পড়ে যাওয়া খাবার তুলে খাবেন কি.একবার শরীরে প্রবেশ করলে সিসার একটি অংশ রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
.সন্তানসম্ভবা নারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি আছে। হাড়ে জমে থাকা সিসা গর্ভাবস্থায় আবার রক্তে চলে আসতে পারে। সেখান থেকে গর্ভের শিশুও আসতে পারে সিসার সংস্পর্শে।
ফলে গর্ভের শিশুর বিকাশেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরেও সিসা ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘদিন সিসার সংস্পর্শে থাকলে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির সমস্যা, রক্তস্বল্পতা এবং প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সিসা শরীরের একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করে। হৃদ্রোগজনিত ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।
অর্থাৎ শরীরে সামান্য সিসা ঢুকলেই যে সঙ্গে সঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়বেন, তা নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে সিসা শরীরে জমতে থাকলেও ক্ষতি হতে পারে। তাই সিসার সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা জরুরি।
.তারিখ পার হয়ে যাওয়া খাবার খাব কি.প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরেও সিসা ক্ষতি করতে পারে। .বাংলাদেশের শিশুদের ঝুঁকি কতটাগবেষকেরা বাংলাদেশের শিশুদের খাবারের অভ্যাস বিবেচনায় নিয়েও একটি হিসাব করেছেন। সাধারণত গ্রামাঞ্চলের শিশুরা প্রতিদিন কতটা ভাত খায়, তা ধরে তাঁরা অনুমান করেছেন, এ ধরনের দূষিত হাঁড়িতে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে কতটা সিসা গ্রহণ করতে পারে।
এই মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, এমন হাঁড়িতে রান্না করা ভাত খেলে কোনো শিশুর দৈনিক খাদ্য থেকে সিসা গ্রহণের পরিমাণ এফডিএ’র নির্ধারিত দৈনিক রেফারেন্স মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি হতে পারে। তবে এই সংখ্যাটিকে গবেষণায় সরাসরি মেপে দেখা হয়নি। গবেষকেরা শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করেননি।
তাঁরা খাবারে পাওয়া সিসার পরিমাণ এবং শিশুদের সাধারণ ভাত খাওয়ার হিসাব ব্যবহার করে সম্ভাব্য সিসা গ্রহণের পরিমাণ অনুমান করেছেন। অর্থাৎ এটি একটি মডেলভিত্তিক হিসাব, সরাসরি স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফল নয়। এমনকি এই গবেষণা থেকে বাংলাদেশে মোট সিসা-দূষণের কত অংশ রান্নার হাঁড়ি থেকে আসছে, সেটিও জানা যায়নি।
সিসার সংস্পর্শের আরও অনেক উৎস আছে। তবে গবেষণাটি দেখিয়েছে, রান্নার পাত্রও এমন একটি উৎস হতে পারে, যেটি এত দিন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। .অর্গানিক খাবার কি আসলেই বেশি পুষ্টিকর.গ্রামাঞ্চলের শিশুরা প্রতিদিন কতটা ভাত খায়, তা ধরে গবেষকেরা অনুমান করেছেন, এ ধরনের দূষিত হাঁড়িতে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে কতটা সিসা গ্রহণ করতে পারে।
.গবেষণার ফল জানার পর অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, ঘরের অ্যালুমিনিয়ামের সব হাঁড়ি-পাতিল কি ফেলে দিতে হবে। এই গবেষণা সব ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পরীক্ষা করেনি। এটি মূলত স্ক্র্যাপ ধাতু দিয়ে তৈরি স্থানীয় পাত্র নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।
তাই সব অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িকে বিপজ্জনক বলা ঠিক হবে না। গবেষকেরা পরামর্শ দিয়েছেন, খাবার রান্নার জন্য এমন পাত্র বেছে নিতে, যার নিরাপত্তা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা পরীক্ষা-সংক্রান্ত প্রমাণ আছে। সন্দেহজনক পাত্র ব্যবহার করতে হলে স্টিলের তারের জালি দিয়ে জোরে ঘষে পরিষ্কার করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
অম্লধর্মী খাবার রান্না এবং ধাতব খুন্তি দিয়ে জোরে নাড়াচাড়া করার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। তবে এসব সাবধানতা মেনে চললেই দূষিত পাত্র নিরাপদ হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পাশাপাশি গবেষকেরা বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনকে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলের জন্য স্পষ্ট নিরাপত্তামান নির্ধারণ ও কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।
স্ক্র্যাপ ধাতু থেকে তৈরি পাত্রের কাঁচামাল পরীক্ষা করা এবং বাজারে বিক্রির আগে তৈরি পণ্যে সিসা খাবারে মিশছে কি না, তা যাচাই করার ব্যবস্থা প্রয়োজন। সূত্র: আইসিডিডিআর,বি এবং টক্সিক কুকওয়্যার: লেড এক্সপোজার ফ্রম অ্যালুমিনিয়াম পটস ইন বাংলাদেশ, রিসার্চ গেট ডটকম.অনেকে দুধজাত খাবার খেতে পারে না কেন।






মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।