লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়রের মসনদে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিথ্যা রমন: ইতিহাস গড়ে জয়ী ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেত্রী, যুক্তরাষ্ট্রের দুই শীর্ষ শহরে প্রগতিশীলদের জয়জয়কার

লস অ্যাঞ্জেলেস (আন্তর্জাতিক ডেস্ক): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং বিশ্বের বিনোদন ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রবীণ নেতাকে ধরাশায়ী করে এক নজিরবিহীন ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেত্রী নিথ্যা রমন। নির্বাচনি প্রচারণার শুরুতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও আন্ডারডগ প্রার্থী হিসেবে গণ্য করা হলেও ভোটের লড়াইয়ে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসের ৪৩তম মেয়র এবং শহরের ইতিহাসের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী মেয়র ক্যারেন বাসকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেছেন। গোটা রাজনৈতিক জীবনে কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজয়ের স্বাদ না পাওয়া প্রভাবশালী নেত্রী ক্যারেন বাস বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের পরাজয় স্বীকার করে নিথ্যা রমনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এই যুগান্তকারী ফলাফলের মধ্য দিয়ে নিউ ইয়র্ক সিটির পর যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় জনবহুল মহানগরীর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ক্ষমতাও সরাসরি প্রগতিশীল ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টদের হাতে ন্যস্ত হলো।
পেশাগত জীবনে একজন অত্যন্ত দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদ (আরবান প্ল্যানার) হিসেবে সুপরিচিত নিথ্যা রমনের জন্ম ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে তিনি অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় বেড়ে ওঠেন। উচ্চশিক্ষায় তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে বিশ্ববিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি বহু বছর ধরে নগর দারিদ্র্য, বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন এবং টেকসই আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর স্বামী ভল্লি চন্দ্রশেখরন মার্কিন টেলিভিশন জগতের একজন সফল লেখক ও প্রযোজক, যিনি বিশ্বখ্যাত কমেডি সিরিজ ‘থার্টি রক’ এবং ‘মডার্ন ফ্যামিলি’র মতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠানের চিত্রনাট্য লিখে প্রশংসিত হয়েছেন। দুই যমজ সন্তান কর্ণ ও কাবেরীকে নিয়ে তাঁরা লস অ্যাঞ্জেলেসের সিলভার লেক এলাকায় বসবাস করেন।
নিথ্যা রমনের মূলধারার রাজনীতিতে উত্থান শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। সে বছর লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলের ডিস্ট্রিক্ট ৪ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি তৎকালীন শক্তিশালী ক্ষমতাসীন কাউন্সিলরকে পরাজিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এর মাধ্যমে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়া প্রথম এশীয়-আমেরিকান এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। সিটি কাউন্সিলে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহার ব্যবস্থাপনা, গৃহহীনতা ও স্বাস্থ্য, জননিরাপত্তা এবং চার্টার রিভিউ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসের সবচেয়ে বড় ক্ষত হিসেবে চিহ্নিত হাজার হাজার বাস্তুহারা ও গৃহহীন মানুষের জন্য মানবিক আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ এবং বাড়িওয়ালাদের অযৌক্তিক উচ্ছেদ বন্ধে তিনি আপসহীন অবস্থান নেন।
এবারের মেয়র নির্বাচনে নিথ্যা রমনের বিজয়ের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এবং পরিবর্তনকামী নতুন প্রজন্মের তরুণ ভোটারদের অকুণ্ঠ সমর্থন। বিশেষ করে ২০২৫ সালের প্রলয়ঙ্করী লস অ্যাঞ্জেলেস দাবানলের ভয়াবহ বিপর্যয় মোকাবিলায় তৎকালীন মেয়র ক্যারেন বাসের চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও অনুপস্থিতি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন যখন আগুন নেভাতে ও ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয় দিতে হিমশিম খাচ্ছিল, তখন নগর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তহীনতা রাজনৈতিক সমালোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই বাস্তবতায় নিথ্যা রমন প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক অচলাবস্থা ভেঙে শহরের জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাস, হলিউডে চলমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কর্মী ছাঁটাইয়ের সংকট থেকে শ্রমিকদের চাকরি রক্ষা, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং অভিবাসী সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার স্পষ্ট রূপরেখা ঘোষণা করে সাধারণ মানুষের মন জয় করেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকেরা নিথ্যা রমনের এই ঐতিহাসিক উত্থানকে নিউ ইয়র্ক সিটির নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানির সফলতার সঙ্গে তুলনা করছেন। বিখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ারের পুত্র জোহরান মামদানিও ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট হিসেবে নিউ ইয়র্কের নগরপিতা নির্বাচিত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলের প্রধান দুটি মহানগরী একই সাথে সমাজতান্ত্রিক দর্শনে বিশ্বাসী দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত দুই নেতার অধীনে আসাকে আমেরিকার জাতীয় রাজনীতিতে এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটন ডিসির নবনির্বাচিত মেয়র জেনিস লুইস জর্জসহ এই প্রগতিশীল জয়জয়কারে রিপাবলিকান শিবিরে গভীর হতাশা ও ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই সমাজতান্ত্রিক বিজয়ের তীব্র সমালোচনা করে এটিকে ‘ইতিহাসের চরমতম বিপর্যয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে নিন্দুকদের সমালোচনা উপেক্ষা করে ২০২৭ সালের সুপার বোল এবং ২০২৮ সালের বহুল প্রতীক্ষিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস আয়োজনের মহাযজ্ঞ সামনে রেখে লস অ্যাঞ্জেলেসকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নিথ্যা রমন।

মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।