এনসিপিতে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল: জামায়াতের সঙ্গে জোট ও অগণতান্ত্রিক কমিটি পুনর্গঠনের প্রতিবাদে শীর্ষ নারী নেতাদের পদত্যাগ, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য হারানোর শঙ্কায় বিশ্লেষকেরা

ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দেশের সমসাময়িক রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গঠিত তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) তীব্র অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও নেতৃত্বের সংকট ব্যাপকভাবে প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটির আসন সমঝোতা ও ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক জোট গঠন, কোনো ধরনের জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন ছাড়াই আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন এবং দলে নারীর মর্যাদা ও নেতৃত্বকে কোণঠাসা করার অভিযোগ তুলে দলটির শীর্ষস্থানীয় পদধারী নারী নেতারা একে একে পদত্যাগ করছেন। বৃহস্পতিবার এনসিপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনের আনুষ্ঠানিক পদত্যাগের ঘোষণার পর দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আদর্শিক স্বাতন্ত্র্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সামান্তা শারমিনের এই প্রস্থানের মধ্য দিয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন নিয়ে দলটির মধ্যকার দীর্ঘদিনের সুপ্ত মতবিরোধ পুনরায় রাজপথে ও গণমাধ্যমে তীব্র রূপ নিয়েছে।
এনসিপির ভেতরের এই সংকট ও মতপার্থক্যের সূত্রপাত হয়েছিল মূলত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে, যখন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আসন ভাগাভাগি ও নির্বাচনি সমঝোতা নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচনা শুরু হয়। ওই সময় দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিবের পদে থাকা ডা. তাসনিম জারা আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন। নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ বার্তায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল কিংবা বিশেষ জোটের প্রার্থী না হয়ে তিনি স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে চান। যদিও ওই বক্তব্যে তিনি সরাসরি জামায়াতের নাম উল্লেখ করেননি, তবে তাঁর পদত্যাগের পরপরই এনসিপির ভেতরে জামায়াতবিরোধী অসন্তোষের বিস্ফোরণ ঘটে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়ে জামায়াতের সঙ্গে কোনো ধরনের জোট না করার জন্য জোর দাবি জানান দলটির অন্তত ৩০ জন কেন্দ্রীয় নেতা। কিন্তু সেই প্রতিবাদ উপেক্ষা করেই জোট প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হলে পরদিনই যুগ্ম আহ্বায়কের পদ ছাড়েন আরেক প্রভাবশালী নারী নেতা তাজনূভা জাবীন, যিনি ফেসবুক পোস্টে প্রকাশ্যেই এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র নয় মাসের মাথায় এবার দল ছাড়লেন প্রতিষ্ঠাকালীন অন্যতম শীর্ষ কাণ্ডারি সামান্তা শারমিন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তারুণ্যের প্রত্যাশা নিয়ে যখন এনসিপি যাত্রা শুরু করেছিল, তখন তিনি দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পদত্যাগের দীর্ঘ ব্যাখ্যা তুলে ধরে তিনি জানান, নীতিগত কিংবা কৌশলগত কোনো দিক থেকেই জামায়াতে ইসলামী এনসিপির মিত্র হওয়ার উপযুক্ত নয়। এই জোট করার কারণে এনসিপিকে মারাত্মক রাজনৈতিক মূল্য দিতে হচ্ছে। সামান্তা শারমিন তাঁর বিবৃতিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, জাতীয় নাগরিক পার্টির নিজস্ব কোনো স্পষ্ট রাজনৈতিক লাইন বা দর্শন না থাকার কারণে তারা কার্যত জামায়াতের বিশাল সাংগঠনিক কাঠামোর ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় বিভিন্ন মৌলিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্বাধীন ভূমিকা রাখার পরিবর্তে এনসিপিকে জামায়াতের হয়ে প্রতিক্রিয়ামূলক ও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার চরম পরিপন্থী।
দলের ভেতরে বিরাজমান পুরুষতান্ত্রিক ও রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধেও অত্যন্ত কঠোর অভিযোগ তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, এনসিপির সামনে সুযোগ ছিল নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নতুন ধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণ করার। সে জন্য শুধু কিছু নারীকে দলে পদ দিয়ে রাখাই যথেষ্ট ছিল না; বরং নেতৃত্ব, সংখ্যাগত অনুপাত, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তব সাংগঠনিক ক্ষমতায় তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা ছিল অপরিহার্য। কিন্তু এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্ব সেই প্রগতিশীল পথ বেছে নেয়নি, বরং দলটির অভ্যন্তরীণ চর্চা উল্টো নারীবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। এর পাশাপাশি কোনো গণতান্ত্রিক সম্মেলন বা কাউন্সিল না ডেকে গত ২৩শে অক্টোবর আহ্বায়ক কমিটি একতরফাভাবে পুনর্গঠনের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। ওই রদবদলে স্বচ্ছ কোনো মাপকাঠি ছাড়াই বেশ কয়েকজনকে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং সামান্তা শারমিনকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক থেকে অবনমন করে সাধারণ যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রচলিত পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই স্বৈরতান্ত্রিকভাবে এই রদবদল ঘটানো হয়েছে, যা নেতৃত্বের জবাবদিহিতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে।
দলের গুরুত্বপূর্ণ নারী নেতাদের এমন ধারাবাহিক পদত্যাগ এবং আদর্শিক বিচ্যুতির অভিযোগের মুখে এনসিপির শীর্ষ পর্যায় থেকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে এনসিপি তার সঠিক পথেই অবস্থান করছে। তিনি বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলে নেতাকর্মীদের যোগদান বা পদত্যাগ একটি নিতান্তই স্বাভাবিক সাংগঠনিক ঘটনা। জোট গঠনের শুরু থেকেই একটি নির্দিষ্ট অংশের আপত্তি ছিল এবং তাঁরাই এখন ধীরে ধীরে পদত্যাগ করছেন, যাকে দল ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করছে। তিনি আরও জানান, নিষ্ক্রিয় পদগুলো সচল করতে এবং কার্যক্রমে গতি সঞ্চার করতেই আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং আগামী ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হবে।
অন্যদিকে দলটির আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন দাবি করেছেন যে, জামায়াতের সাথে জোটের কারণে এনসিপির ‘জামায়াতিকরণ’ হচ্ছে বলে যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিচার এবং রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের প্রশ্নে জাতীয় স্বার্থে সংসদে ও রাজপথে এই কৌশলগত ঐক্যের প্রয়োজন রয়েছে, তবে স্বতন্ত্র দল হিসেবে এনসিপি নিজস্ব কর্মসূচি ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই চলছে। তিনি আরও দাবি করেন, হাতে গোনা কয়েকজন পরিচিত নেতা দল ছাড়লেও তৃণমূল পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক নারী কর্মী ও নেত্রী এনসিপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হচ্ছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জুলাই আন্দোলনের মূল অংশীদার তরুণ ও নারীদের আস্থা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে এবং জামায়াতের ছায়াতলে নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেললে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে এনসিপির বিকাশ অচিরেই বড় ধরনের সংকটে পর্যবসিত হতে পারে।

মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।