সরকারের জাতীয় বাংলা এআই ও এলএলএম মহাপরিকল্পনা: নিজস্ব ডেটাসেন্টার ও তথ্য সার্বভৌমত্ব রক্ষার মহৎ উদ্যোগের বিপরীতে বিশাল অবকাঠামো, জিপিইউ কম্পিউট ও অতীত ব্যর্থতার চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

ঢাকা: বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলা ভাষার স্বতন্ত্র পরিচয় ও ডেটা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। বিদেশি বিভিন্ন বৃহৎ এআই মডেল যেমন ওপেনএআই-এর চ্যাটজিপিটি কিংবা গুগলের জেমিনির ওপর অতিনির্ভরশীলতা কমিয়ে নিজেদের ভাষায় শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, প্রশাসনিক নথি বিশ্লেষণ এবং দাপ্তরিক কার্যক্রমের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বাংলা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ (Bangla LLM) তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আইসিটি বিভাগ এবং বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের (বিডিডিসিএল) যৌথ সমন্বয়ে এই উচ্চাভিলাষী জাতীয় প্রযুক্তি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হয়েছে।
এই মহাপরিকল্পনার মূল দর্শন ও বাস্তবায়ন কৌশল তুলে ধরে বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের (বিডিডিসিএল) চেয়ারম্যান এবং আইসিটি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, সরকার বর্তমানে দেশে একটি কার্যকর ও যুগোপযোগী ‘এআই নীতিমালা’ চূড়ান্তকরণের চূড়ান্ত ধাপে রয়েছে। নীতিমালা অনুমোদনের পরপরই নিজস্ব ভাষার এআই মডেল তৈরির মূল কর্মপরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে। সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো এমন একটি সার্বজনীন বাংলা এআই মডেল তৈরি করা, যার সমস্ত ডেটাসেট, ট্রেইনিং ক্লাস্টার এবং সার্ভার হোস্টিং সম্পূর্ণভাবে দেশের ভূখণ্ডের ভেতরে সংরক্ষিত থাকবে। সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা আরও স্পষ্ট করেন যে, প্রচলিত এনালগ বা স্ক্যান করা ম্যানুয়াল নথিপত্র সরাসরি এআই মডেলে ব্যবহার করা সম্ভব নয়; তাই আইসিটি বিভাগের একটি বিশেষ উদ্যোগে বর্তমানে দেশের হাজার হাজার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গ্রন্থ, সাহিত্য ও সরকারি প্রকাশনাকে আধুনিক কর্পাস বা ডেটাসেটে রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যত বেশি বৈচিত্র্যময় ও নির্ভুল বাংলা টেক্সট অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হবে, আমাদের জাতীয় বাংলা এলএলএম তত বেশি সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সরকারের এই স্বাবলম্বী প্রযুক্তি ভাবনাকে নীতিগতভাবে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করলেও এর বাস্তব প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে গভীর ভাবনার অবকাশ রয়েছে বলে মনে করছেন দেশের তথ্যপ্রযুক্তি গবেষক ও শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের (আইআইটি) অধ্যাপক শফিউল আলম খান এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, একটি জাতীয় এআই মডেল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ডেটার কঠোর শ্রেণীবিন্যাস বা ক্লাসিফিকেশন নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতীয় ডেটাভাণ্ডারে কোন তথ্য সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, কোনটি গোপনীয় এবং কোনটি রাষ্ট্রের অতি-সংবেদনশীল তথ্য—তা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ না করে এআই মডেল প্রশিক্ষণ দিলে তা তথ্য নিরাপত্তা ও সাইবার সুরক্ষায় বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। পাশাপাশি বাংলা ভাষার বিভিন্ন আঞ্চলিক উপভাষা, ব্যাকরণগত জটিলতা এবং সঠিক শব্দের অর্থ অনুধাবনের উপযুক্ত অ্যালগরিদম তৈরি করার জন্য ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা অপরিহার্য।
প্রকল্পটির কারিগরি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছেন প্রযুক্তি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব সুমন আহমেদ সাবির। তিনি উল্লেখ করেন, একটি আন্তর্জাতিক মানের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল তৈরি ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হলে হাজার হাজার উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষায়িত গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) এবং সুপারকম্পিউটিং অবকাঠামোর নিরবচ্ছিন্ন ক্লাউড পরিবেশ প্রয়োজন, যার পেছনে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ জড়িত। অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সতর্ক করেন যে, বাংলাদেশে অতীতে কোনো ধরনের সমন্বিত জাতীয় দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া জুমের বিকল্প হিসেবে ‘বৈঠক’, হোয়াটসঅ্যাপের বিকল্পে ‘আলাপন’, জাতীয় সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপিলিকা’ কিংবা এআই প্ল্যাটফর্ম ‘জি-ব্রেইন’ তৈরির মতো বিচ্ছিন্ন প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছিল; যার কোনোটিই পরবর্তীতে জনগণের কাছে কার্যকর বা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বর্তমান যুগে ওপেন সোর্স বৈশ্বিক মডেলগুলো খুব দ্রুত এবং সাবলীলভাবে বহুভাষিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে চমৎকার বাংলা বলতে ও লিখতে পারছে। ফলে নতুন করে চাকা আবিষ্কারের মতো বিপুল রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে যদি এমন কিছু তৈরি করা হয় যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে পাল্লা দিতে ব্যর্থ হবে, তবে তা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই হবে না।
সার্বিক পর্যালোচনায় প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা সরকারকে পরামর্শ দিয়েছেন যে, বাংলা এআই উদ্যোগটি কেবল সরকারের দাপ্তরিক একটি প্রকল্প হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে দেশের তরুণ গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, সফটওয়্যার প্রকৌশলী এবং মুক্ত উৎস (ওপেন সোর্স) ডেভলপারদের একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করতে হবে। গ্লোবাল ফাউন্ডেশনাল মডেলগুলোকে বাংলা ভাষায় ফাইন-টিউনিং বা বিশেষায়িত করার সমন্বিত কৌশল গ্রহণ করা হলে স্বল্প খরচে এবং দ্রুততম সময়ে একটি বিশ্বমানের ও কার্যকর বাংলা এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব হবে। জাতীয় স্বার্থে তথ্য সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের কার্যকারিতা ও সুদূরপ্রসারী উপযোগিতা বজায় রাখাই হবে ২০২৬ সালের বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।