আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতিতে দিশেহারা পোশাক শ্রমিকেরা: দুই বেলা খেয়েও মাসে পার করা দায়, পাতে মাছ-মাংস ছাড়াই কাটছে মাস, ২৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে ফের উত্তাল শিল্পাঞ্চল

ঢাকা ও আশুলিয়া: দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্পের লাখ লাখ শ্রমিকের দৈনন্দিন জীবনে নেমে এসেছে তীব্র অর্থনৈতিক অন্ধকার। বাজারে চাল, ডাল, তেল, ডিম ও শাকসবজিসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি সাধারণ খেটে খাওয়া পোশাক শ্রমিকদের বেঁচে থাকার লড়াইকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। শিল্পাঞ্চল সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের ভাড়া কলোনিগুলোতে বসবাসরত পোশাক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে মাস শেষে যে বেতন তাঁরা হাতে পান, তা দিয়ে মাসের প্রথম দশ থেকে বারো দিনের বেশি সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারকেই পেট বাঁচাতে পুষ্টিকর খাদ্যতালিকা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে শুধু ভাত আর সামান্য শাকসবজি খেয়ে অর্ধাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে।
আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানার অপারেটর আব্দুল কাদের মোল্লার পারিবারিক চিত্র দেশের সামগ্রিক পোশাক খাতের করুণ বাস্তবতার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। গত কয়েক বছর ধরে তৈরি পোশাক কারখানায় হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে আসা কাদের মোল্লা আক্ষেপভরা কণ্ঠে জানান, বর্তমানে নিত্যপণ্যের যে দাম তাতে দুই বেলা অতি সাধারণ খাবার খেতেই তাঁদের মাসের সব উপার্জন শেষ হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘সব কিছুর দাম কেবল বাড়তেই আছে। যেই বেতন পাই তা দিয়ে দুই বেলা খাই, তারপরও মাসের অর্ধেক দিনও পার করা যায় না। দুই মাস হয়ে গেছে আমাদের পরিবারের কেউ মাছের গন্ধ পর্যন্ত নিতে পারিনি, আর গোশত খাওয়া তো শুধু দুই ঈদের দিনে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।’ কাদের মোল্লার মতো কলোনির আরও অন্তত দশটি পরিবারের চিত্রও হুবহু একই রকম; যেখানে শিশুদের জন্য এক গ্লাস দুধ বা একটি ডিমের বরাদ্দও এক ধরনের বিলাসিতায় রূপ নিয়েছে।
উল্লেখ্য যে, বিগত ২০২৩ সালের শেষভাগে দীর্ঘ আন্দোলনের পর পোশাক শ্রমিকদের জন্য সরকার ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করেছিল। অথচ গত এক বছরে জীবনযাত্রার সার্বিক ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সাভার ও গাজীপুর এলাকার একটি আট বাই দশ ফুটের টিনশেড ঘরের ভাড়াই এখন সাড়ে চার থেকে ছয় হাজার টাকা। এর সঙ্গে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল পরিশোধ করার পর একজন শ্রমিকের হাতে অবশিষ্ট থাকে মাত্র চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারে এক কেজি চালের দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা, তেলের লিটার ১৮০ টাকা ছাড়িয়েছে এবং সামান্য পাঙ্গাশ বা তেলাপিয়া মাছের কেজিও আড়াইশত টাকার ওপরে। এই অবস্থায় চার সদস্যের একটি পরিবারের ন্যূনতম খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতি মাসে অন্তত বিশ থেকে বাইশ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। ফলে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ শেষ হতেই শ্রমিকদের স্থানীয় মুদি দোকান থেকে বাকিতে পণ্য কেনা অথবা চড়া সুদে এনজিও ও সুদের কারবারিদের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণে বাধ্য হতে হচ্ছে।
এই তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষের কারণেই সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও কোনাবাড়ির শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক বিক্ষোভ ক্রমাগত দানা বাঁধছে। শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ পোশাক শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো—বর্তমান অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করে ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা। একই সঙ্গে পোশাক শ্রমিকদের জন্য সরকারি ভর্তুকিযুক্ত রেশন ব্যবস্থা চালু করা, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ন্যায্যমূল্যের ট্রাক সেল শিল্পাঞ্চলের কলোনিগুলোর কাছে বাড়ানো এবং কারখানাগুলোতে লে-অফ ও বেআইনি ছাঁটাই বন্ধ করার জোর দাবি জানানো হচ্ছে। বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবিতেও বেশ কিছু এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ ও কর্মবিরতি পালন করেছেন।
অন্যদিকে পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও কারখানা মালিকরা দাবি করছেন যে, বৈশ্বিক মন্দা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে রপ্তানি ক্রয়াদেশে ধীরগতি এবং গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কারখানার উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা নিয়মিত শ্রমিকদের বেতন দিতেই ব্যাংক ঋণের দ্বারস্থ হচ্ছে। ফলে হঠাৎ করে মজুরি বৃদ্ধি করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়বে। তবে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, যে শ্রমিকদের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের আশি শতাংশেরও বেশি অর্জিত হয়, তাঁদের পরিবার যদি পুষ্টিহীনতা ও ঋণের বোঝায় পিষ্ট হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে পুরো শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতাই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। সরকার, বিজিএমইএ এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অবিলম্বে ত্রিপক্ষীয় জরুরি আলোচনার মাধ্যমে পোশাক শ্রমিকদের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা ও মজুরি সমন্বয়ের টেকসই রূপরেখা প্রণয়ন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।