শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ / সকাল ৬:৫২ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
সংবাদ

স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে সুবিশাল নতুন নির্মাণযজ্ঞ: মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত শেষে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও ব্যালিস্টিক ঘাঁটি পুনর্গঠনে তেহরানের আগ্রাসী রূপরেখা

স্যাটেলাইট চিত্রে ইরানের প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে সুবিশাল নতুন নির্মাণযজ্ঞ: মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত শেষে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ ও ব্যালিস্টিক ঘাঁটি পুনর্গঠনে তেহরানের আগ্রাসী রূপরেখা

তেহরান ও ওয়াশিংটন: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের মধ্যেই নিজেদের মূল কৌশলগত প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্থাৎ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ও অবকাঠামো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করছে ইরান। সম্প্রতি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ও পশ্চিমা জোটের পরিচালিত আকস্মিক বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটির অন্তত দুটি প্রধান কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে দ্রুতগতির মেরামতের পাশাপাশি নতুন সুবিশাল নির্মাণযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাণিজ্যিক উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ সংস্থা প্ল্যানেট ল্যাবস এবং ম্যাক্সার টেকনোলজিসের সংগৃহীত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে ইরানের এই গোপন সামরিক কর্মযজ্ঞের স্পষ্ট তথ্য ও ছবি ধরা পড়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার ক্ষত মুছে ফেলে ইরান আরও আধুনিক, সুরক্ষামূলক ও ভূগর্ভস্থ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডার পুনরুজ্জীবিত করতে এক আগ্রাসী মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

উপগ্রহ চিত্রে যে দুটি ঘাঁটিতে সবচেয়ে বেশি তৎপরতা লক্ষ করা গেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো তেহরানের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত সেমনান স্পেস সেন্টার এবং আলবোরজ পর্বতমালার সন্নিকটে অবস্থিত ঐতিহাসিক শাহরুদ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র। ক্যালিফোর্নিয়ার জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের (সিএনএস) জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ডেকার এভেলেথ উপগ্রহ চিত্রগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, গত অক্টোবর মাসে ইসরায়েলি বিমান হামলায় শাহরুদ ঘাঁটির যে মূল ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তার চারপাশ পরিষ্কার করে ইতোমধ্যে নতুন অবকাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঘাঁটির পাশেই মাটির নিচে গভীর সুড়ঙ্গ খনন এবং কঠিন জ্বালানিচালিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের জন্য বিশাল আয়তনের অন্তত তিনটি সুরক্ষিত নতুন ভবন তৈরি করা হচ্ছে। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, এই ভবনগুলোর চারপাশে পুরু মাটির প্রাচীর বা ‘আর্থ বার্মস’ নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে কোনো একটি ইউনিটে বিস্ফোরণ বা আক্রমণ ঘটলেও সংলগ্ন ভবনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়া অক্ষত থাকে।

সামরিক বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, শাহরুদ ও সেমনান ঘাঁটি দুটি ইরানের সর্বোচ্চ অভিজাত সামরিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অ্যারোস্পেস ফোর্সের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে থাকে। এই ঘাঁটিগুলো মূলত ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং উপগ্রহ উৎক্ষেপক রকেটের কঠিন জ্বালানি ইঞ্জিন তৈরি ও পরীক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মধ্যম ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সিরিজ—যেমন ‘খেইবার শেকান’, ‘ফাত্তাহ’ হাইপারসনিক এবং ‘শাহাব’ সিরিজের কঠিন জ্বালানি রকেট মটর এখানেই প্রস্তুত ও সংযোজন করা হয়। অক্টোবর মাসের হামলায় ক্ষেপণাস্ত্রের জ্বালানি মিশ্রণ কারখানাগুলো ধ্বংস হওয়ার যে দাবি ওয়াশিংটন ও তেলআবিব করেছিল, স্যাটেলাইট চিত্রে দৃশ্যমান নতুন ভবনগুলোর উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তেহরান দ্রুততার সঙ্গে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে এবং তাদের নিজস্ব প্রযুক্তি দিয়ে উৎপাদন ক্ষমতা আগের চেয়েও সুরক্ষিত স্থানে স্থানান্তর করছে।

এই দ্রুতগতির পুনর্গঠন মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক সামরিক ভারসাম্যের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি বা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্যই নয়, বরং ইউরোপের সীমানা পর্যন্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে সরাসরি শত শত ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে নিজেদের অস্ত্রের বিধ্বংসী শক্তির জানান দিয়েছিল ইরান। সেই হামলার পাল্টা জবাবে ইসরায়েল বিমান হামলা চালালেও ইরানের এই ভূগর্ভস্থ নির্মাণ প্রমাণ করছে যে, প্রচলিত বিমান হামলা দিয়ে দেশটির জটিল সুড়ঙ্গ ও পাহাড়ি ক্ষেপণাস্ত্র কারখানাগুলো সম্পূর্ণ অকেজো করা কার্যত অসম্ভব।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের আশঙ্কার মুখে তেহরান তাদের সামরিক প্রতিরোধ নীতিতে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সামরিক নেতৃত্বের একাধিক বিবৃতিতে বারবার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ইরানের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কোনো ধরনের বিদেশি আলোচনা বা সমঝোতার অন্তর্ভুক্ত হবে না। নতুন উপগ্রহ চিত্রের এই উন্মোচনের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং আসন্ন দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধির স্পষ্ট ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে।

সূত্র: BBC Bangla

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV