সুন্দরবনে ফের মাথাচাড়া দিচ্ছে অস্ত্রধারী দস্যু বাহিনী: টোকেন মানি ও জিম্মি বাণিজ্যে দিশেহারা উপকূলের জেলেরা, শ্যামনগরে বনজীবীদের বিক্ষোভের মুখে যৌথ সাঁড়াশি অভিযানের প্রস্তুতি

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা): দেশের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জল ও স্থলভাগে দীর্ঘদিন পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক অস্ত্রধারী বনদস্যু বাহিনী। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সুন্দরবন সংলগ্ন নদ-নদীগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত টহল ও নজরদারির সাময়িক শৈথিল্যের সুযোগ নিয়ে নতুন ও পুরোনো একাধিক অপরাধী চক্র বনের ভেতরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছে। বৈধ সরকারি অনুমতি নিয়ে জীবিকার তাগিদে সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া সাধারণ বনজীবীদের জিম্মি করে চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও প্রাণনাশের হুমকি। বিশেষ করে সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের আওতাধীন সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি, মালঞ্চ, রায়মঙ্গল ও কোবাতক নদীর মোহনাগুলোতে এখন বৈধ বন পাসের চেয়ে দস্যু বাহিনীর দেওয়া ‘টোকেন’ ছাড়া নদীতে জাল ফেলার কোনো সুযোগ থাকছে না বলে অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগী জেলেরা।
সুন্দরবনে প্রায় তিন দশক ধরে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত শ্যামনগর উপজেলার প্রবীণ জেলে কামরুল ইসলাম তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে জানান, বর্তমানে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা বিভিন্ন দস্যু দল নিজেদের মধ্যে অলিখিতভাবে ভাগ করে নিয়েছে। বনে প্রবেশের আগে সরকারি রাজস্ব দিয়ে বন বিভাগের পাস নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও, দস্যুদের চাঁদা পরিশোধ না করলে জেলেদের ট্রলার ও মাছ ধরার সরঞ্জাম ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। চাঁদা আদায়ের ক্ষেত্রে দস্যুরা গ্রহণ করেছে অত্যন্ত অভিনব ও বিপজ্জনক কৌশল। তারা জেলেদের একটি নির্দিষ্ট ক্রমিক নম্বরের পাঁচ বা দশ টাকার পুরোনো ব্যাংক নোট ‘টোকেন’ হিসেবে প্রদান করে। দশ-পনেরো দিনের জন্য বনে যেতে হলে এককালীন তিন মাসের তথাকথিত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পাঁচ টাকার একটি সাধারণ নোটের বিপরীতে জেলেদের গুনতে হচ্ছে ৭০ হাজার টাকা। আবার অপেক্ষাকৃত বড় ট্রলার ও গহিন বনে চলাচলের ক্ষেত্রে অন্য একটি দল দশ টাকার একটি নোটের বিনিময়ে এক লাখ দুই হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জোরপূর্বক আদায় করছে। বনে নৌকায় তল্লাশি চালিয়ে এই নির্দিষ্ট টোকেন নোট দেখাতে না পারলে জেলেদের নির্মম মারধর ও অপহরণ করে মুক্তিপণের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
দস্যুদের এই লাগামহীন চাঁদাবাজি ও অপহরণ বাণিজ্যের কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর, আশাশুনি ও সংলগ্ন এলাকার হাজার হাজার জেলে চরম আতঙ্ক ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। বনে যাওয়ার সাহস হারিয়ে অনেক পরিবার অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। জীবিকা ও নিরাপত্তার এই চরম সংকটে স্থানীয় বনজীবীরা ‘বনদস্যু নির্মূল কমিটির’ ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাতক্ষীরায় লাগাতার বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন। স্থানীয় শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দস্যু দমনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। প্রতিবাদী কর্মসূচি আয়োজনের পর থেকে বনদস্যুরা মুঠোফোনে জেলে নেতাদের বিভিন্ন হুমকি-ধমকি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি বিভিন্ন বাহিনী থাকা সত্ত্বেও বনের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ কি তবে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের হাতে চলে যাচ্ছে?
সুন্দরবনের এই সাম্প্রতিক সংকট অতীতের কঠোর অভিযানের সফলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন সরকারের আমলে র্যাব ও যৌথবাহিনীর ব্যাপক সাঁড়াশি অভিযান ও আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সুন্দরবনের ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সক্রিয় সদস্য বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিল। ওই সময় সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পূর্ণ ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তনের সুযোগে সেই পুরোনো আত্মসমর্পিত দস্যুদের কেউ কেউ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা নতুন কিছু অস্ত্রধারী চক্র সুন্দরবনের চরাঞ্চলে নতুন করে সংগঠিত হয়েছে। বর্তমানে নয়ন বাহিনী, জিয়া বাহিনী ও মঞ্জুর বাহিনীসহ বেশ কয়েকটি নামধারী চক্র বনের ভেতরে ভয়াল ত্রাস সৃষ্টি করে জেলেদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করছে।
বনজীবীদের দেওয়া স্মারকলিপি ও গভীর উদ্বেগের প্রেক্ষিতে উপকূলের নিরাপত্তা পুনর্বহালে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন এবং জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ মোহনাগুলোতে টহল কয়েক গুণ জোরদার করা হয়েছে। কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরবনের শান্তি ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা বজায় রাখতে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বনে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রধারী চক্রকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না এবং অচিরেই জল ও স্থলভাগে ড্রোন ও স্পিডবোটযোগে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে বনদস্যুদের চিরতরে নির্মূল করা হবে। স্থানীয় প্রশাসন জেলেদের অভয় দিয়ে বনে নিয়মিত মৎস্য আহরণে সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেছে, যদিও বাস্তব নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়—তা দেখতে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছেন সুন্দরবনের লাখো বনজীবী।

মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।