শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ / সকাল ৭:১৫ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
সংবাদ

ভারতের কাঁটাতার ও করিডোর অবরোধে শেরপুর সীমান্তে আটকা পড়েছে ১৩০ বন্য হাতি: খাদ্য সংকটে লোকালয়ে ঢুকে মানুষের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, কূটনৈতিক উদ্যোগের তাগিদ

ভারতের কাঁটাতার ও করিডোর অবরোধে শেরপুর সীমান্তে আটকা পড়েছে ১৩০ বন্য হাতি: খাদ্য সংকটে লোকালয়ে ঢুকে মানুষের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাত, কূটনৈতিক উদ্যোগের তাগিদ

শেরপুর ও ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে স্বাভাবিক বিচরণ ও খাদ্যসংস্থান হারিয়ে বাংলাদেশ অংশে দীর্ঘ দিন ধরে স্থায়ীভাবে আটকা পড়ে আছে ১৩০টিরও বেশি বিপন্ন প্রজাতির এশীয় বন্য হাতি। সীমান্তের ওপারে ভারতের মেঘালয় অংশে একতরফাভাবে কাঁটাতারের দুর্ভেদ্য বেড়া নির্মাণ, হাতির চিরাচরিত পরিযান পথগুলোতে স্থায়ী লোহার গেট আটকে দেওয়া এবং ভারতীয় কৃষকদের কাজু বাদামের বাগান গড়ে তোলার কারণে বন্য হাতির দলগুলোর নিজ আবাসস্থলে ফিরে যাওয়ার সব পথ কার্যত রুদ্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বাংলাদেশের শেরপুরের নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এলাকার সীমান্তঘেঁষা বনাঞ্চলে দলবদ্ধভাবে সারা বছর অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে এই আন্তঃসীমান্ত হাতির পাল। বনে পর্যাপ্ত খাদ্য না থাকায় হাতির দল প্রতিদিন সন্ধ্যার পর লোকালয় ও কৃষিজমিতে হানা দিচ্ছে, যার ফলে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে বন্য হাতির রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতী সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে।

বন বিভাগের ঐতিহাসিক নথি ও গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জামালপুরের বকশীগঞ্জ থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৫০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় যুগ যুগ ধরে বন্য হাতির অবাধ বিচরণের জন্য ৪৪টি প্রাকৃতিক করিডোর বা গেট এবং অন্তত ১১টি নদী ও পাহাড়ি ছড়া পথ উন্মুক্ত ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বন্য এশীয় হাতির পাল ঋতুভেদে এই পথগুলো ব্যবহার করে ভারত ও বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও মেঘালয় রাজ্য কর্তৃপক্ষ সীমান্তের স্পর্শকাতর এই করিডোরগুলোতে সুউচ্চ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করেছে। একই সাথে ভারতীয় অংশের উর্বর বনভূমিতে বাণিজ্যিক কাজু বাদামের ব্যাপক চাষাবাদ শুরু হওয়ায় হাতিদের প্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ অংশে ঢুকে পড়া হাতিগুলো আর কখনোই ওপারে ফিরে যেতে পারছে না। প্রকৃতি সংরক্ষণে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন (IUCN)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে যেখানে এই এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাসকারী হাতির সংখ্যা ছিল ৫১টি, বর্তমানে তা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ১৩০ থেকে ১৩৫টিতে দাঁড়িয়েছে।

ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিম জানিয়েছেন, একটি পূর্ণবয়স্ক এশীয় হাতির জন্য প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ কেজি প্রাকৃতিক খাদ্য এবং সমপরিমাণ সুপেয় পানির প্রয়োজন হয়। বিশাল এই খাদ্যচাহিদা মেটাতে হাতিদের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ঘুরে বেড়াতে হয়। কিন্তু গারো পাহাড়ের বাংলাদেশ অংশের বনাঞ্চল ব্যাপকভাবে উজাড় হয়ে যাওয়ায় এবং সামাজিক বনায়নের নামে আকাশমণি বা ইউক্যালিপটাসের মতো অপ্রাকৃতিক গাছের বাগান করায় বনে হাতির কোনো পুষ্টিকর খাদ্য অবশিষ্ট নেই। অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা হাতির পাল খাবারের তীব্র সংকটে পড়ে গাছের ছাল ও বাকল ছিঁড়ে খাচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুম শুরু হওয়ার সাথে সাথে খাদ্যের হাহাকার তীব্র রূপ নিলে ক্ষুধার্ত হাতির দলগুলো দলবেঁধে সীমান্তঘেঁষা গ্রামের রোপা আমন ও বোরো ধানের জমিতে হানা দিতে বাধ্য হচ্ছে। পানিহাটা ও হালুয়াঘাট সীমান্তে প্রতিদিন বিকেলে ছোট-বড় ও শাবকসহ ২০ থেকে ২৫টি হাতির দলকে লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসতে দেখা যায়।

ক্ষেতের পাকা ফসল ও নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষায় স্থানীয় কৃষকরাও বেপরোয়া প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। নালিতাবাড়ীর কৃষক মোস্তাক হোসেন ও হালুয়াঘাটের কৃষক ইদ্রিস আলী জানান, সারাবছরের একমাত্র সম্বল ধানের জমি বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ফসলের চারপাশে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের খোলা তার দিয়ে ফাঁদ পাতা হচ্ছে। এ ছাড়া হাতির পাল তাড়াতে রাতের বেলা মশাল জ্বালানো, পটকা ফোটানো এবং ধারালো দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া দেওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চলছে। এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যেই ভয়াবহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক যুগে শেরপুর ও ময়মনসিংহ সীমান্ত অঞ্চলে অন্তত ৩৫টি বন্য হাতির মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এসব হাতির অধিকাংশই কৃষকদের পাতা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে, পিটিয়ে অথবা বর্শা ও গুলির আঘাতে প্রাণ হারিয়েছে। অন্যদিকে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে বহু নিরীহ কৃষক ও গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়েছে এবং শত শত একর জমির ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে বন বিভাগের সহায়তায় ‘এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম’ (ইআরটি) গঠন করে গ্রাম পাহারা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হলেও এই স্থায়ী সংকটের কোনো টেকসই সমাধান মিলছে না। শেরপুরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন সরকার সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের বসবাস ও বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক অধিকারের মধ্যে যে তীব্র দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে, তা কেবল স্থানীয় উদ্যোগ দিয়ে নিরসন সম্ভব নয়। পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ফোরামে পৌঁছেছে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক নোট পাঠিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী জানিয়েছেন, ভারত আন্তরিকভাবে সীমান্ত গেট উন্মুক্ত না করলে এবং যৌথভাবে অভয়ারণ্য করিডোর ব্যবস্থাপনা চালু না করলে গারো পাহাড়ের এই বিরল এশীয় হাতির অস্তিত্ব যেমন চিরতরে বিলীন হবে, তেমনি সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবনের নিরাপত্তাও চিরতরে বিপন্ন হয়ে পড়বে।

সূত্র: BBC Bangla

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV