প্রতিটি দিনকে গতকালের চেয়ে উন্নত করার উপায়: আত্মউন্নয়ন, সময়ের সদ্ব্যবহার ও আত্মপর্যালোচনায় ইসলামি জীবনদর্শনের বাস্তবমুখী দিকনির্দেশনা

ঢাকা: মানুষের জীবন মূলত কতগুলো নির্দিষ্ট দিবস, রজনী ও মুহূর্তের সমষ্টি; যা প্রতিনিয়ত একমুখী ধারায় সামনে এগিয়ে চলে এবং একবার অতিবাহিত হয়ে গেলে তা কখনোই পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। ইসলামি জীবনদর্শনের সুগভীর নীতিমালায় একজন সচেতন মানুষের প্রতিটি দিনকে কেবল বেঁচে থাকার একটি রুটিন হিসেবে নয়, বরং আত্মউন্নয়ন, নৈতিক পরিশুদ্ধি এবং গতকালের ভুল শুধরে নেওয়ার এক নতুন সূচনা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত এক তাৎপর্যপূর্ণ ইসলামি প্রবাদে বর্ণিত রয়েছে—‘যার দুটি দিন সমান হলো, সে ক্ষতিগ্রস্ত; আর যার আজকের দিনটি গতকালের চেয়ে খারাপ হলো, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত।’ এই মৌলিক দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে ব্যক্তিজীবনকে প্রতিনিয়ত উন্নততর পর্যায়ে উন্নীত করতে এবং অপচয় হওয়া সময়ের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকগণ বাস্তবধর্মী কর্মপদ্ধতি ও আত্মপর্যালোচনার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনায় হঠাৎ অর্জিত হয় না; বরং প্রতিদিনের সচেতন প্রচেষ্টা, নিখুঁত নিয়ত ও ধারাবাহিক অভ্যাসের সংমিশ্রণেই একজন মানুষ সত্যিকার অর্থে গতকালের চেয়ে আজকের দিনে নিজেকে আরও উন্নত ও সফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
প্রতিটি নতুন দিনকে গতকালের চেয়ে উত্তম ও অর্থবহ করার প্রাথমিক ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিয়মিত আত্মপরীক্ষা বা আত্মপর্যালোচনা করা, যাকে ইসলামি পরিভাষায় ‘মুহাসাবা’ বলা হয়ে থাকে। নিজের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের হিসাব নিজে নেওয়ার বিষয়ে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) গভীর তাগিদ দিয়ে উল্লেখ করেছিলেন, ‘তোমাদের হিসাব নেওয়ার আগেই তোমরা নিজেদের হিসাব নিজেরা নাও এবং চূড়ান্ত হাশরের পেশির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো।’ সুনানে তিরমিজির ২৪৫৯ নম্বর হাদিসে বর্ণিত এই অমর বাণী মানুষকে প্রতিদিন ঘুমানোর পূর্বে অথবা নতুন দিনের সূচনালগ্নে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করার শিক্ষা দেয়। পবিত্র কুরআনের সুরা হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতেও মহান আল্লাহ বিশ্বাসীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির লক্ষ্য করা উচিত যে আগামীকালকের জন্য সে কী পাঠিয়েছে।’ দিনের শেষে একাগ্রচিত্তে নিজের লাভ ও ক্ষতির হিসাব মিলানো, কৃত ভুলত্রুটির জন্য আন্তরিক অনুতাপ প্রকাশ করা এবং সৎকাজগুলোর জন্য শুকরিয়া আদায় করার অভ্যাস মানুষের অন্তরে জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগিয়ে রাখে, যা তাকে পরবর্তী দিনটিতে যেকোনো ধরনের অনৈতিক বা অপচয়মূলক আচরণ থেকে সতর্কতার সঙ্গে বিরত থাকতে সাহায্য করে।
দিনের সফলতার ক্ষেত্রে ভোরবেলা বা সকালের প্রারম্ভিক মুহূর্তের সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে। ইসলামি সংস্কৃতিতে ভোরের স্নিগ্ধ পরিবেশ ও ফজরের পরবর্তী সময়কে বিশেষ বরকতের সময় হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সকালে ঘুম থেকে জেগে জীবনের নতুন আয়ু লাভ করায় সৃষ্টিকর্তার দরবারে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলে সারা দিনের গতিপথ সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। অলসতা ও অহেতুক কালক্ষেপণে সকালের মূল্যবান সময় নষ্ট না করে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজে নেমে পড়লে সময়ের অপচয় বহুলাংশে হ্রাস পায় এবং ব্যক্তিগত উৎপাদনশীলতা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদ ও কর্মদক্ষতা বিশেষজ্ঞরা যে দৈনিক রুটিন বা টাইম ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, চৌদ্দশত বছর পূর্বেই ইসলামের অনুশাসন ও নবীজির দৈনন্দিন জীবনে তার বাস্তব ও সফল প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়েছে। সকালের এই সুশৃঙ্খল ভিত্তি মানুষকে অলসতার চক্র ভেঙে নতুন উদ্যমে দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মানসিক দৃঢ়তা এনে দেয়।
মানুষ ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়; কোনো দিনে অলসতা, অসতর্ক আচরণ বা অনাকাঙ্ক্ষিত পাপকাজে জড়িয়ে পড়া মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতার অংশ হতে পারে। তবে ইসলামি শিক্ষায় অতীত ভুলের মায়াজালে আবদ্ধ থেকে হতাশায় নিমজ্জিত হওয়ার কোনো অবকাশ রাখা হয়নি; বরং দ্রুত অতীতের ভুল সংশোধন করে সৎকাজে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সুনানে তিরমিজির ১৯৮৭ নম্বর হাদিসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুস্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা প্রদান করে বলেছেন, ‘অন্যায়ের পরপরই কোনো ভালো কাজ করো, যা সেই অন্যায়কে মুছে দেবে।’ এই চিরন্তন শিক্ষা প্রমাণ করে যে, গতকালের যেকোনো ত্রুটির ক্ষতিপূরণ হিসেবে আজ অন্তত একটি অতিরিক্ত সৎকাজ, কারও প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন অথবা একটি নেক আমল সম্পাদন করে জীবনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অতীতের ভুলের জন্য অনুশোচনা ও ভবিষ্যতে তা পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় সংকল্প মানুষের নৈতিক চরিত্রকে প্রতিদিন আরও সমৃদ্ধ করে।
যেকোনো কর্মকাণ্ডের ফল ও আধ্যাত্মিক মূল্য নির্ভর করে ব্যক্তির আন্তরিক উদ্দেশ্য তথা নিয়তের ওপর। সহিহ বুখারির প্রথম হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই সমস্ত কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।’ এর অর্থ হলো, একজন মানুষের দৈনন্দিন পার্থিব কাজ—যেমন পরিবারের জন্য হালাল জীবিকা অন্বেষণ, শিক্ষাদান ও অধ্যয়ন, পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের সেবা অথবা জনকল্যাণমূলক সমাজসেবা—সবই যদি আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার এবং সৃষ্টিজীবের কল্যাণের পবিত্র নিয়তে সম্পাদিত হয়, তবে তা সাধারণ কর্মকাণ্ডের সীমানা পেরিয়ে মহান ইবাদতে রূপ লাভ করে। প্রতিদিন সকালে নিজের কাজের পেছনে এই মহৎ উদ্দেশ্য যুক্ত করা হলে অন্তরে অপার মানসিক প্রশান্তি ও কাজের প্রতি একাগ্রতা সৃষ্টি হয়, যা ক্লান্তি ও হতাশা দূর করতে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
এক দিনে জীবনের সামগ্রিক রূপান্তর ঘটানো সম্ভব নয়; বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অগ্রগতির সম্মিলিত রূপই মানুষকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নেয়। সহিহ বুখারির ৬৪৬৫ নম্বর হাদিসে মহানবী (সা.) উম্মতকে উৎসাহিত করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।’ প্রতিদিন নিজের ভেতরে সামান্য একটি শুভ অভ্যাস গড়ে তোলা অথবা একটি মন্দ আচরণ ত্যাগ করার আন্তরিক প্রয়াসই দীর্ঘমেয়াদে আত্মউন্নয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। বিখ্যাত ইসলামি পণ্ডিত ইবনে রজব আল-হাম্বলি তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম’-এর প্রথম খণ্ডের ৩৮২ পৃষ্ঠায় প্রাচীন এক মনীষীর অমূল্য উদ্ধৃতি উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘হে আদম সন্তান, তুমি তো শুধু কতগুলো দিনের সমষ্টি; যখনই একটি দিন চলে যায়, তোমার জীবনের একটি অংশও ক্ষয় হয়ে যায়।’ ক্ষণস্থায়ী এই পার্থিব জীবনে সময় হারানোর গভীর উপলব্ধি প্রতিটি মানুষকে গতকালের চেয়ে আজ এবং আজকের চেয়ে আগামীকালকে আরও শ্রেয়, ন্যায়নিষ্ঠ ও সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার নিরন্তর প্রেরণা জোগায়।

মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।