শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ / সন্ধ্যা ৬:০৪ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়ব্রেকিং

‘যে মসজিদের পাশে বড় হয়েছি, সেখান থেকেই উচ্ছেদ হতে হয়েছে’

‘যে মসজিদের পাশে বড় হয়েছি, সেখান থেকেই উচ্ছেদ হতে হয়েছে’
‘যে মসজিদের পাশে বড় হয়েছি, সেখান থেকেই উচ্ছেদ হতে হয়েছে’

ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের কাছেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মসজিদ। ফ্যাকাশে দেয়াল আর সুচালো খিলানগুলো এখনো অক্ষত। মসজিদের আঙিনায় সবুজ ও সাদা টাইলসের অস্তিত্বও রয়েছে। তবে যে মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদ ও আশপ...

ভারতের রাজধানী দিল্লির কেন্দ্রস্থলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের কাছেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট মসজিদ। ফ্যাকাশে দেয়াল আর সুচালো খিলানগুলো এখনো অক্ষত। মসজিদের আঙিনায় সবুজ ও সাদা টাইলসের অস্তিত্বও রয়েছে।

তবে যে মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই মসজিদ ও আশপাশের এলাকায় জীবন গড়ে তুলেছিলেন, তাদের অধিকাংশই এখন সেখান থেকে বিতাড়িত। ৫০ বছর বয়সি মোহাম্মদ ওয়াসিম ধ্বংসস্তূপের ওপারে একটি জায়গা দেখিয়ে বলেন, সেখানে এক সময় তাদের বাড়ি ছিল। ওই বাড়িতেই তার বাবার বিয়ে হয়েছিল।

কয়েক দশক পর একই জায়গায় বিয়ে হয় তার মেয়ের। এখন সেই বাড়ির কোনো অস্তিত্ব নেই। ওয়াসিমের পরিবারসহ কয়েকশ মানুষ মসজিদটির আশপাশের ছোট ছোট ঘরে বসবাস করতেন।

ভারতের রাজধানীর অভিজাত ও কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকাগুলোর অন্যতম রেসকোর্সে সামরিক স্থাপনা, অভিজাত ক্লাব ও বিশাল বাংলোর মাঝখানে গড়ে উঠেছিল এসব বসতি। তাদের অনেকেরই বসবাস ছিল কয়েক প্রজন্ম ধরে। আশপাশের ধনী পরিবারগুলোতে গাড়িচালক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং মালি হিসেবে কাজ করতেন তারা।

সরকারি জমিতে অবৈধভাবে ঘর নির্মাণের অভিযোগে গত ৭ অক্টোবর এসব বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি হওয়ায় নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরে প্রশাসন। উচ্ছেদের পর প্রায় ৭১৭টি পরিবারকে দিল্লি থেকে ৩১ মাইল দূরে সাভদা ঘেভরা কলোনিতে স্থানান্তর করা হয়।

উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন বাসিন্দারা। তাদের যুক্তি ছিল, কর্মস্থল, সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্ক থেকে এত দূরে সরিয়ে নেওয়া হলে তাদের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হবে। তবে গত আগস্টে আদালত তাদের পুনর্বাসনের পক্ষে রায় দেয়।

উচ্ছেদের সময় মসজিদটি এবং কাছের একটি হিন্দু মন্দির অক্ষত রাখা হলেও একই দিন স্থাপনা দুটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই মসজিদ চত্বরে প্রবেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সাধারণত মুসল্লিদের ফটক থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

নিরাপত্তা রক্ষীদের অনুরোধ করলে কখনো কখনো ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পাওয়া যায়। সরকারের দাবি, মসজিদটি যে জমির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার মালিকানা সরকারের। তবে মসজিদ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ১৯৭৭ সালে জমিটি ওয়াক্‌ফ সম্পত্তি হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছিল।

ধর্মীয় বা দাতব্য কাজের জন্য উৎসর্গ করা সম্পত্তিকে ইসলামি আইনে ওয়াক্‌ফ বলা হয়। মসজিদটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা হিসেবেও তালিকাভুক্ত। দিল্লি ওয়াক্‌ফ বোর্ডের দাবি, মসজিদটির বয়স প্রায় ৩০০ বছর।

অন্য হিসাব অনুযায়ী, এর বয়স ১২৫ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে। মসজিদের পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের দাবিতে এবং স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে ওয়াক্‌ফ বোর্ড। এছাড়া মসজিদটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কায় আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন একজন মুসল্লিও।

গত ২৯ অক্টোবর সরকার আদালতকে জানায়, ওয়াক্‌ফ বোর্ডের আপত্তি বিবেচনা করে আগামী চার সপ্তাহ মসজিদটির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ভাঙার কাজ চলাকালে সেখানে নামাজের সুযোগ দেওয়া হবে না। মুসল্লিদের আইনজীবী এ যুক্তির বিরোধিতা করেন।

আদালত এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন। মসজিদটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বসবাস করা হিন্দু ও মুসলমানদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের স্মৃতি আর শেকড়ের কতটুকু তারা ধরে রাখতে পারবেন। ওয়াসিম এখনো সুযোগ পেলেই মসজিদে নামাজ পড়তে ফিরে আসেন।

তবে কখনো কখনো নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ফিরিয়ে দেন। সম্প্রতি এক বিকেলে মসজিদে মাত্র চার-পাঁচজন মুসল্লি ছিলেন। বাইরে একটি জেনারেটর চলছিল।

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেটির সাহায্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছিল। ওয়াসিমের ভাষায়, এই জায়গার সঙ্গে আমাদের হৃদয় ও পুরো জীবন জড়িয়ে আছে। এখানেই খেলাধুলা করে আমাদের শৈশব কেটেছে।

তাহলে কীভাবে আমরা এই জায়গা ছেড়ে যেতে পারি। বিধবা রেখার স্মৃতিতেও জড়িয়ে আছে সেই কলোনি। আশপাশের বাড়িতে থালাবাসন ধোয়ার কাজ করতেন তিনি।

সেখানেই সংসার গড়েছেন, সন্তানদের বড় করেছেন এবং স্থানীয় মন্দিরে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজেও অংশ নিয়েছেন। পুনর্বাসন নিয়ে তার প্রশ্ন, কয়েক দশক ধরে গড়ে তোলা একটি জীবন কীভাবে উপড়ে নিয়ে অন্য কোথাও নতুন করে সাজানো সম্ভব। নতুন জায়গায় তিনি কাজ পাচ্ছেন না।

তার ১৯ বছর বয়সি ছেলেও কর্মসংস্থানের সংকটে রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দিল্লিতে শ্রমজীবী মানুষের উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কয়েক দশক ধরে বসবাস করলেও জমির বৈধ মালিকানার কাগজপত্র না থাকায় তাদের বারবার শহরের দূরবর্তী প্রান্তে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

নগরবিষয়ক গবেষক মুক্তা নায়েক বিবিসিকে বলেন, পুনর্বাসনের ফলে মানুষ কর্মস্থল ও সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে জীবিকা ও আয় কমে যায়। এ বিষয়ে দিল্লির হাউজিং এজেন্সি, স্থানীয় পৌরসভা ও কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমি বিভাগের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা পাওয়া যায়নি।

২০০৬ সালে দিল্লির হরিয়ানা সীমান্তের কাছে কৃষি জমির ওপর সাভদা ঘেভরা কলোনি গড়ে তোলা হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্যই এই আবাসন প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল। তবে সেখানে স্থানান্তরের পরও অনেক পরিবারের জীবনযাত্রায় নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

সাভদায় যাওয়ার পর বাবলুর দৈনন্দিন জীবনও বদলে গেছে। প্রতিদিন ভোর ৫টায় বাড়ি থেকে বের হয়ে তিনবার ট্রেন বদলে মেট্রোরেলে সন্তানদের নিয়ে মধ্য দিল্লিতে তাদের পুরোনো স্কুলে যান। ক্লাস শেষ হতে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে।

এ সময় তিনি সাবেক এলাকার বাইরে একটি চায়ের দোকানে অপেক্ষা করেন। তার কাজ থাকলে স্ত্রীকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। বাবলু এক সময় রেসকোর্স এলাকার একটি ক্লাবে কাজ করতেন।

এখন কাজ পেয়েছেন দিল্লির উত্তর-পূর্বে অবস্থিত মিরাট শহরে। তিনি বলেন, বাসিন্দারা জানত, এক সময় এলাকা ছাড়তে হতে পারে। কিন্তু তারা আশা করেছিলেন, এমন কোথাও পুনর্বাসন করা হবে, যেখান থেকে কর্মস্থলে যাতায়াত ও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

সরকারের দাবি, রেসকোর্সের কাছাকাছি উপযুক্ত আবাসন পাওয়া যায়নি। আদালতে সাভদা ঘেভরার স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও পরিবহন ব্যবস্থার কথা তুলে ধরে এলাকাটিকে পুনর্বাসনের উপযোগী বলে উল্লেখ করে সরকার। কিন্তু ৬৩ বছর বয়সি নাঈম খানের কাছে এসব সুবিধা যথেষ্ট নয়।

তার দুই নাতির শ্রবণ ও বাক্‌প্রতিবন্ধিতা রয়েছে। তাদের বিশেষায়িত চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজন, যা ওই এলাকায় নেই বলে জানান তিনি। নাঈমের আক্ষেপ, আমাদের ২০ বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।

রেসকোর্সে বসবাসের সময় বাসিন্দাদের ছোট-খাটো আয়ের নানা সুযোগ ছিল। কেউ আশপাশের বাড়িতে থালাবাসন ধুতেন, কেউ বাগানের পরিচর্যা করতেন, আবার কেউ ফেলে দেওয়া বোতল সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। বয়স্ক বিধবা আখতারি প্রতিদিন মিনারেল ওয়াটারের বোতল কুড়িয়ে প্রায় ১০০ রুপি আয় করতেন।

অবশিষ্ট রুটি শুকিয়ে গবাদিপশুর খাবার হিসেবেও বিক্রি করতেন। উচ্ছেদের পর এসব আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। আখতারি বলেন, এখানে বসবাসকারী আমরা সবাই উচ্ছেদ হয়ে এসেছি।

সবাই দরিদ্র ও অসহায়। নিজেরাই যখন সংকটে, তখন অন্যকে ঘরের কাজে কে নিয়োগ দেবে। রেসকোর্সে অভাবে পড়লে মসজিদের ইমাম বা প্রতিবেশীরা তাকে আটা কেনার টাকা দিতেন।

কিন্তু এখানে কেউ তা করবে না। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।

সূত্র: আমার দেশ

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

জাতীয়

ইসরায়েল নির্বাচন

xwhatsapp-strokecopylinkgoogleAdd Al Jazeera on GoogleinfoIsraeli রাষ্ট্রপতি Isaac Herzog receives the official results of the ele...

জাতীয়

হয়রানির শিকার ২৮ সংবাদকর্মী, প্রাণ গেছে একজনের: বিএজির প্রতিবেদন

গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে অন্তত ২৮ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন হত্যার শিকার হয়েছেন। শারীরিক...

জাতীয়

মোগল জাহাজে ডাকাতিতে জড়িত ব্যক্তির নামে নিউইয়র্কের সৈকত 

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের অন্যতম ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্র ‘জোন্স বিচ’। প্রতিবছর কোটি কোটি দর্শনার্থী এই সমুদ্রসৈকতে ঘুরতে আসেন। কিন্ত...

জাতীয়

মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা বুধবার

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে গঠিত মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা বুধবার (৪ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হতে য...

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV