শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ / সন্ধ্যা ৬:১৬ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
সংবাদ

যে গল্পগুলো সবাই বলেন না, সেগুলোই বলেন নন্দিতা

যে গল্পগুলো সবাই বলেন না, সেগুলোই বলেন নন্দিতা

বলিউডের তারকাজগতে নন্দিতা দাসের পরিচয়টি আলাদা। তাঁর অভিনীত ছবির কথা ভাবলে মনে পড়ে এমন কিছু চরিত্রকে, যাঁরা ভালোবাসার অধিকার চান, অন্যায়ের বিচার চান, নিজের মতো করে বাঁচতে চান। ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়েও সেই মানুষদের খুঁজেছেন তিনি। কখনো সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় বিপর্যস্ত জনপদে, কখনো দেশভাগের ক্ষত বয়ে বেড়ানো লেখকের জীবনে, কখনো শহরের রাস্তায় খাবার পৌঁছে দেওয়া শ্রমিকের প্রতিদিনের সংগ্রামে।

আজ ৭ নভেম্বর এই অভিনেত্রী, নির্মাতা ও মানবাধিকারকর্মীর জন্মদিন। ১৯৬৯ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া নন্দিতা আজ ৫৭ বছর পূর্ণ করলেন। তিন দশকের বেশি সময়ের অভিনয়জীবনে ১০টি ভাষায় ৪০টির বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর নির্মাতাদের তালিকায় আছেন মৃণাল সেন, শ্যাম বেনেগাল, দীপা মেহতা, আদুর গোপালকৃষ্ণন, ঋতুপর্ণ ঘোষ ও মণি রত্নম। সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর এই শিল্পীর কাছে চলচ্চিত্র নিজের ভাবনা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘চলচ্চিত্র আমার জন্য একটা লক্ষ্যপূরণের হাতিয়ার ।’

চরিত্রের ভেতর দিয়ে কঠিন প্রশ্ন দীপা মেহতার ‘ফায়ার’ সিনেমার কথা হয়তো অনেকের মনে আছে। ১৯৯৬ সালের এই ছবিতে নন্দিতা সীতা, আর শাবানা আজমি রাধা। একই পরিবারের দুই ভাইয়ের স্ত্রী তাঁরা। দাম্পত্যের নিঃসঙ্গতা ও অবহেলার মধ্যে পরস্পরের কাছে আশ্রয় খুঁজে পান দুজন। সেই নির্ভরতা থেকে গড়ে ওঠে ভালোবাসা।

নারীর আকাঙ্ক্ষা, নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার এবং পরিবারের চিরাচরিত বিধিনিষেধ—এসব প্রশ্ন সামনে এনেছিল ‘ফায়ার’। ভারতে ছবিটিকে ঘিরে তীব্র প্রতিবাদ ও সহিংসতাও হয়। সীতা চরিত্রের মধ্য দিয়ে নন্দিতা এমন এক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠেন, যার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শিল্পের স্বাধীনতা ও সম্পর্কের সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন।

দুই বছর পর একই নির্মাতার ‘আর্থ’–এ তাঁকে দেখা যায় অন্য এক বিপন্ন পৃথিবীতে। দেশভাগের পটভূমিতে তৈরি ছবিটিতে তাঁর সহশিল্পী আমির খান ও রাহুল খান্না। ধর্মীয় বিভাজন কীভাবে চেনা মানুষের সম্পর্ক বদলে দেয়, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের জায়গায় নিয়ে আসে বিদ্বেষ—ছবিটির গল্পে তা উঠে আসে।

জগমোহন মুন্দ্রার ‘বাওয়ান্ডার’-এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই আরও প্রত্যক্ষ। রাজস্থানের সমাজকর্মী ভাঁওরী দেবীর ওপর সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও তাঁর বিচার পাওয়ার সংগ্রাম থেকে অনুপ্রাণিত ছবিটিতে নন্দিতার চরিত্রের নাম সাঁওরি। নির্যাতনের পরও যাঁকে সামাজিক বাধা ও অপমানের মুখোমুখি হতে হয়। বাস্তবের একজন মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি চরিত্রে অভিনয়ের দায়িত্ব কতটা, তা নিয়ে সে সময় কথা বলেছিলেন নন্দিতা। জানিয়েছিলেন, কয়েকটি দৃশ্য ধারণের অভিজ্ঞতা তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল।

বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছেও তাঁর একাধিক স্মরণীয় কাজ রয়েছে। মৃণাল সেনের ‘আমার ভুবন’ (২০০২) ছবিতে অভিনয় করেন কৌশিক সেন ও শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। এই ছবির জন্য কায়রো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান তিনি।

ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘শুভ মহরত’-এ নন্দিতা সাংবাদিক মল্লিকা সেন। চলচ্চিত্রের মহরতের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে এক অভিনেত্রীর মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মল্লিকা। রাখী ও শর্মিলা ঠাকুরের পাশাপাশি এই রহস্যকাহিনিতে নন্দিতার চরিত্রও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুমন ঘোষের ‘পদক্ষেপ’-এ আবার কাজ করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

মেহরিন জব্বারের উর্দু ছবি ‘রামচাঁদ পাকিস্তানি’ কিংবা আদুর গোপালকৃষ্ণনের মালয়ালম ছবি ‘নালু পেন্নুঙ্গাল’ তাঁকে নিয়ে গেছে ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে। ভাষা বদলেছে, গল্প বলার ধরন বদলেছে। প্রতিটি অভিজ্ঞতা তাঁর নিজের জীবনকেও সমৃদ্ধ করেছে বলে জানিয়েছেন নন্দিতা।

ক্যামেরার পেছনেও মানুষঅভিনয়ে যে প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হয়েছেন, নির্মাতা হিসেবেও সেগুলো তাঁকে ভাবিয়েছে। পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র পরিচালনায় তাঁর অভিষেক ‘ফিরাক’ দিয়ে। ২০০৮ সালে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ছবিটির প্রিমিয়ার হয়। তবে নির্মাণে হাতেখড়ি আরও আগে। নিজের ওয়েবসাইটে জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালে ‘ইমপ্রিন্ট ইন ক্লে’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিলেন।

‘ফিরাক’-এর পটভূমি গুজরাটের ২০০২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পরবর্তী সময়। সহিংসতা থেমেছে, কিন্তু মানুষের মনের ভয় থামেনি। ঘর হারানো মানুষ, অনাথ শিশু, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত সংগীতশিল্পী—বিভিন্ন চরিত্রের জীবনে থেকে গেছে অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা। তাদের গল্পগুলোকে পাশাপাশি এনে নন্দিতা দেখেছেন বিপর্যস্ত মানুষের সম্পর্ক ও বেঁচে থাকার সংকট। নাসিরুদ্দিন শাহ, দীপ্তি নাভাল ও পরেশ রাওয়াল অভিনীত ছবিটির চিত্রনাট্য তিনি লিখেছেন শুচি কোঠারির সঙ্গে।

প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের এক দশক পর আসে ‘মান্টো’। উর্দু কথাসাহিত্যিক সা’দত হাসান মান্টোর জীবনের চারটি অস্থির বছর নিয়ে নির্মিত ছবিটির প্রিমিয়ার হয় ২০১৮ সালের কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘আঁ সার্তেঁ রিগার’ বিভাগে। মান্টোর চরিত্রে অভিনয় করেন নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকী। অন্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন রসিকা দুগাল ও তাহির রাজ ভাসিন।

প্রিয় শহর বোম্বে ছেড়ে লাহোরে যাওয়া, দেশভাগের অভিঘাত, আর্থিক অনটন, লেখার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ—এসবের মধ্যে নিজের স্বাধীন সত্তা বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেন মান্টো । সময়ের নিষ্ঠুর বাস্তবতা লিখতে গিয়ে একজন লেখককে কী মূল্য দিতে হয়, তা বুঝতে চেয়েছেন নন্দিতা। ছবিটি তৈরির ছয় বছরের অভিজ্ঞতা পরে লিখেছেন ‘মান্টো অ্যান্ড আই’ বইয়ে ।

তৃতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ‘জুইগাটো’য় তাঁর মনোযোগ শহরের শ্রমজীবী মানুষের দিকে। কারখানার চাকরি হারিয়ে মানস খাবার সরবরাহের কাজ নেয়। সংসার চালাতে তাকে ছুটতে হয় অ্যাপের নির্দেশনা মেনে। গ্রাহকের রেটিং ও বাড়তি আয়ের শর্তের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে প্রতিদিনই নতুন পরীক্ষার মুখে পড়ে সে। স্ত্রী প্রতিমাও উপার্জনের সুযোগ খুঁজতে শুরু করে। এই দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন কপিল শর্মা ও শাহানা গোস্বামী।

ওডিশার ভুবনেশ্বরে ধারণ করা ছবিটিতে আয়রোজগারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাম্পত্য, আত্মমর্যাদা ও নারীর স্বাধীনতার প্রশ্ন। নন্দিতা জানিয়েছেন, অতিমারির সময় ছবিটির ভাবনা আসে। খাবার সরবরাহকারীদের ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়ছিল, অথচ তাঁদের সংগ্রাম আড়ালেই থেকে যাচ্ছিল। ২০২২ সালে টরন্টোতে বিশ্ব প্রিমিয়ারের পর বুসান ও কেরালার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও প্রদর্শিত হয় ‘জুইগাটো’। প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ২০২৩ সালের ১৭ মার্চ।

সূত্র: Prothom Alo - Latest

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV