বাংলাদেশে সংবাদকর্মীদের জন্য কর্মপরিবেশ ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। গত অক্টোবর মাসে দেশে অন্তত ২৮ জন সংবাদকর্মী হত্যা, শারীরিক হামলা, আইনি হয়রানি ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) তাদের অক্টোবর মাসের নিয়মিত মনিটরিং প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। সংস্থাটির গবেষণা ও মনিটরিং সেলের সম্পাদক মাহমুদুল হাছান স্বাক্ষরিত এই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, আলোচ্য সময়ে একজন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এছাড়া রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসীদের হাতে অন্তত ১৮ জন সংবাদকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ৯ জন আইনি হয়রানি ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই প্রতিবেদনে অক্টোবর মাসকে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও আশঙ্কাজনক সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্যানুযায়ী, নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া গ্রামে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি একটি চায়ের দোকানে অবস্থানকালে মোটরসাইকেলে আসা দুইজন অজ্ঞাতপরিচয় বন্দুকধারী তাকে লক্ষ্য করে পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। তার সহকর্মীদের দাবি, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে অনুসন্ধানী লেখালেখির কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড দেশের সাংবাদিক সমাজের মধ্যে গভীর ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সংবাদকর্মীকে এভাবে প্রাণ দিতে হওয়া মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিএজে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।
শারীরিক হামলার শিকার ১৮ জন সংবাদকর্মীর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা অত্যন্ত বর্বরোচিত। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের অস্ত্রের মিছিলের ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে চারজন সাংবাদিক হামলার শিকার হন। হামলাকারীরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়ে মারধর করে এবং এতে একজন সাংবাদিকের মাথা ফেটে যায়। ঘটনার সময় অন্যান্য সাংবাদিকরা উদ্ধার করতে এগিয়ে এলে তাদেরও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, গাজীপুরের টঙ্গীতে এক সাংবাদিককে অপহরণ ও নির্যাতনের রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জন সন্ত্রাসী মোটরসাইকেলে এসে ওই সাংবাদিকের চোখ-মুখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায়। তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে মারধর করা হয় এবং এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এমনকি তাকে এক নারীর সঙ্গে বিবস্ত্র করে নগ্ন ভিডিও ধারণ করা হয় এবং মাজার বস্তির মাদকের সংবাদ প্রকাশ করলে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
ঝিনাইদহে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, একটি কলেজের ইট বিক্রির অনিয়মের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হন। কলেজের অধ্যক্ষের মদদে বহিরাগতরা ওই দুই সাংবাদিককে রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আহত সাংবাদিকদেরই উল্টো মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ডিবি পুলিশের মাদকসংশ্লিষ্টতার সংবাদ প্রকাশের জেরেই তাদের পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। এছাড়া আইনি হয়রানির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক চিকিৎসকের দায়ের করা সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় দুই সাংবাদিককে আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছে। অন্যদিকে, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে মৃত নারীদের সঙ্গে বিকৃত যৌনাচারের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় একজন সাংবাদিককে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। মর্গের সাবেক এক সহকারী ফোন করে তাকে ভয় দেখান এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দেন।
বিএজে তাদের প্রতিবেদনে এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য একটি ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটি মনে করে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার এই অপচেষ্টা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সত্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সমাজে দুর্নীতির বিস্তার ঘটবে। বিএজে অবিলম্বে প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং সাংবাদিকদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর আইন ও পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর চলমান এই আক্রমণ ও হয়রানি বন্ধ না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!