জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) থেকে পদত্যাগ করেছেন শ্রীনগরের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য এবং দলটির অন্যতম প্রধান শিয়া মুখ আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ মেহদি। ওমর আবদুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন দলের জন্য এটি একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ রুহুল্লাহ মেহদি কেবল দল থেকেই নয়, বরং লোকসভার সদস্যপদ থেকেও ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। জম্মু ও কাশ্মীরের বদগামে তার বাবা আগা সৈয়দ মেহদির ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আবেগঘন সমাবেশে তিনি এই নাটকীয় ঘোষণাটি দেন। এর মাধ্যমে ন্যাশনাল কনফারেন্সের সাথে তার দীর্ঘ ২৪ বছরের সম্পর্কের অবসান ঘটল। তার এই পদত্যাগপত্রটি লোকসভার স্পিকার গ্রহণ করলে শ্রীনগর লোকসভা আসনে উপ-নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হবে। তবে কেবল পদত্যাগই নয়, তিনি দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে চার পৃষ্ঠার একটি কঠোর রাজনৈতিক অভিযোগনামা পেশ করেছেন, যেখানে তিনি দলটিকে জনগণের আবেগের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।
রুহুল্লাহ মেহদি তার পদত্যাগপত্রে অভিযোগ করেছেন যে, ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষ যে বিশাল ম্যান্ডেট এবং আবেগ নিয়ে ন্যাশনাল কনফারেন্সকে জয়ী করেছিল, নির্বাচনের লড়াই শেষ হওয়ার পরপরই দলটি সেই অবস্থান থেকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। তিনি লিখেছেন যে, জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের মানুষ ইতিহাসের এক বিশাল বোঝা বহন করে চলেছে এবং এই অঞ্চলের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ যেন 'ড্যামোক্লেসের তলোয়ারের' মতো ঝুলে আছে। ২০১৯ সালে ৩৭০ ধারা এবং ৩৫-এ অনুচ্ছেদ বাতিলের ঘটনাকে তিনি কাশ্মীরিদের অধিকারের ওপর একটি 'নির্লজ্জ আঘাত' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, অধিকার ছাড়া একটি জাতির অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ২০১৯ সালের সেই সংকটময় পরিস্থিতি রাজনীতিকে পুনর্গঠন করার এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামের একটি সুযোগ ছিল, যা ত্যাগ ও লড়াই দাবি করেছিল। তিনি আশা করেছিলেন যে ন্যাশনাল কনফারেন্স সেই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবে।
মেহদি তার চিঠিতে আরও উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ওমর আবদুল্লাহর কাছে গিয়েছিলেন এবং দল তাকে সংগ্রামের আশ্বাস দিয়েছিল। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি এনসি-র সাথে তার রাজনীতিকে আরও জোরালোভাবে যুক্ত করেছিলেন এই আশায় যে, এটি অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য একটি আন্দোলন গড়ে তুলবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সেই আশা পূরণ হয়নি। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি দলের হয়ে অক্লান্ত প্রচার চালিয়েছিলেন এবং মানুষ তাদের ক্ষোভ ও প্রত্যাশা নিয়ে এনসি-কে ভোট দিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী ময়দান ঠান্ডা হওয়ার আগেই দল তার অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলে। তিনি এটিকে কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবেও অভিহিত করেছেন। তার মতে, যখন জম্মু ও কাশ্মীর এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি, তখন একটি দৃঢ় ও সংকল্পবদ্ধ নেতৃত্বের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এনসি সেই জায়গাটি ছেড়ে দিয়ে কেবল সরকার গঠন এবং রাজ্যপদ পুনরুদ্ধারের একটি অস্পষ্ট ও বৃথা প্রতিশ্রুতির পেছনে ছুটছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, যখনই তিনি এই বিষয়গুলো নিয়ে সরব হয়েছেন, তখনই দলের সাথে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। তিনি মনে করেন, বর্তমান সময়ে রাজনীতি থেকে এই ধরনের পিছুটান জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষের অধিকার হরণের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে। রুহুল্লাহ মেহদি দীর্ঘদিন ধরেই বন্দিদের মুক্তি, ৩৭০ ধারা পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণের যৌক্তিকীকরণের মতো বিষয়গুলোতে সোচ্চার ছিলেন। আদর্শগত এই পার্থক্য এবং দলের নিষ্ক্রিয়তাই শেষ পর্যন্ত তাকে এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। চিঠির শেষে তিনি অত্যন্ত আবেগপূর্ণভাবে লিখেছেন যে, তিনি তার বাবার আত্মার কাছে এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে তিনি সুযোগসন্ধানী রাজনীতির বদলে আদর্শের পথে চলবেন। ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, মেহদি এখনই অন্য কোনো দলে যোগ দিচ্ছেন না, বরং তিনি তরুণদের নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা কালেক্টিভ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছেন। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করেছেন যে, ওমর আবদুল্লাহর সরকারকে অস্থিতিশীল করার কোনো ইচ্ছা তার নেই।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!