ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে এক অবিশ্বাস্য ও ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল পুনে। নারী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে দ্রুততম অর্ধশতকের নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন ভারতীয় অলরাউন্ডার প্রেমা রাওয়াত। উত্তরাখণ্ডের হয়ে খেলতে নেমে হায়দরাবাদের বিপক্ষে মাত্র ১৪ বলে হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করে তিনি ক্রিকেট বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এর আগে নারী টি-টোয়েন্টিতে দ্রুততম হাফসেঞ্চুরির রেকর্ডটি ছিল ১৫ বলের, যা যৌথভাবে বেশ কয়েকজন ব্যাটারের দখলে ছিল। প্রেমা সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়ে নারী ক্রিকেটে পাওয়ার হিটিংয়ের এক নতুন উচ্চতা স্পর্শ করেছেন। তার এই বিধ্বংসী ইনিংসটি সাজানো ছিল ছয়টি চার এবং চারটি বিশাল ছক্কায়, যা প্রতিপক্ষের বোলারদের কার্যত দিশেহারা করে দিয়েছিল। তার এই অসামান্য ব্যাটিং নৈপুণ্যে ভর করে উত্তরাখণ্ড নির্ধারিত ২০ ওভারে ২ উইকেট হারিয়ে ১৮৭ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায়।
পুনের মাঠে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে প্রেমা রাওয়াত যখন ব্যাটিং করতে নামেন, তখন ইনিংসের ১৮তম ওভার চলছিল। চার নম্বর পজিশনে ব্যাটিং করতে নেমে তিনি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ছিলেন। মিডিয়াম পেসার সাক্ষী রাওয়ের বলে টানা তিনটি বাউন্ডারি মেরে তিনি তার ঝোড়ো ইনিংসের সূচনা করেন। এরপর অফস্পিনার ভাঙ্কা পূজার এক ওভারে তিনি ১৮ রান সংগ্রহ করেন। ইনিংসের শেষ ওভারে কুঞ্চলা নিতেশার ওপর চড়াও হয়ে শেষ চার বলে তিনি যথাক্রমে ৬, ৪, ৪ এবং ৬ রান তুলে নেন। এই শেষ বলের ছক্কাটির মাধ্যমেই তিনি তার ঐতিহাসিক ১৪ বলের হাফসেঞ্চুরি পূর্ণ করেন এবং অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। উইকেটের অন্য প্রান্তে তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন রাঘবী বিস্ট, যিনি ৫০ বলে ৭২ রানের একটি চমৎকার অপরাজিত ইনিংস খেলেন। তবে গ্যালারির সমস্ত আলো কেড়ে নেন ২৪ বছর বয়সী প্রেমা, যার ব্যাটিং তাণ্ডবে হায়দরাবাদের বোলারদের কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসেনি।
প্রেমার এই কীর্তির আগে নারী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুততম হাফসেঞ্চুরির রেকর্ডটি ছিল ১৫ বলের। ২০২২ সালে ওয়ারউইকশায়ারের হয়ে মেরি কেলি, ২০২৬ সালে পাকিস্তানের হয়ে ফাতিমা সানা এবং ওটাগো ও সারির হয়ে লরা হ্যারিস যথাক্রমে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে ১৫ বলে হাফসেঞ্চুরি করেছিলেন। প্রেমা রাওয়াত সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়ে এখন এককভাবে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। তার এই পারফরম্যান্স কেবল উত্তরাখণ্ডের জন্যই নয়, বরং ভারতীয় নারী ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান শক্তিরও বহিঃপ্রকাশ। ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন পারফরম্যান্স জাতীয় দলের নির্বাচকদের জন্য একটি বড় বার্তা হিসেবে কাজ করবে, কারণ প্রেমা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এই ম্যাচে তার স্ট্রাইক রেট এবং টাইমিং ছিল দেখার মতো, যা আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের দাবি মেটাতে সক্ষম।
ব্যাটিংয়ে তান্ডব চালানোর পর বল হাতেও সমান উজ্জ্বল ছিলেন প্রেমা রাওয়াত। ১৮৮ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে হায়দরাবাদ শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায়। প্রেমা তার নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের মাধ্যমে হায়দরাবাদের ওপেনার জি কাব্যশ্রী এবং এন ক্রান্তি রেড্ডিকে সাজঘরে ফেরান। বল হাতে তিনি ২ ওভারে মাত্র ১২ রান দিয়ে ২ উইকেট শিকার করেন। তার এই অলরাউন্ড নৈপুণ্যের সামনে হায়দরাবাদ মাত্র ৯৮ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ইনিংস শেষ করতে বাধ্য হয়। উত্তরাখণ্ড বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে এবং প্রেমা রাওয়াত ম্যাচের অবিসংবাদিত সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার বোলিং বৈচিত্র্য এবং লাইন-লেন্থ হায়দরাবাদের ব্যাটারদের রান তোলার কোনো সুযোগই দেয়নি, যা তার ক্রিকেটীয় পরিপক্কতার প্রমাণ দেয়।
প্রেমা রাওয়াতের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখা যায়, চলতি বছরের জুনে ভারতের হয়ে তার অভিষেক ঘটে। এখন পর্যন্ত সাতটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তিনি সাতটি উইকেট শিকার করেছেন। বিশেষ করে এশিয়া কাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে তার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো, যেখানে তিনি মাত্র ৯ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটেও তিনি বেশ সফল। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালোরের (আরসিবি) হয়ে ওম্যানস প্রিমিয়ার লিগ (ডব্লিউপিএল) শিরোপাজয়ী দলের সদস্য ছিলেন তিনি। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ছয় ম্যাচে তিনি তিনটি উইকেট নিয়েছেন। তার ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে ২০২৭ মৌসুমের জন্যও তাকে ধরে রেখেছে আরসিবি কর্তৃপক্ষ। প্রেমার এই নতুন বিশ্বরেকর্ড তাকে আগামী দিনে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!