দেশের বাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের দর বেড়ে ১২৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় এক টাকা বেশি। গত ২৭ অক্টোবর আমদানির ক্ষেত্রে ডলারের সর্বোচ্চ দর ছিল ১২৪ টাকা ১৮ পয়সা, যা মঙ্গলবার ১২৫ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করেছে। একই সঙ্গে খোলাবাজার বা কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম আরও বেড়ে ১২৮ টাকা ২০ পয়সায় উঠেছে। ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সামনের রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানির চাপ বাড়ায় ডলারের বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির দায় পরিশোধের জন্য মাসের শেষ দিকে ডলারের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিনিময় হারের ওপর।
ব্যাংকগুলোর ঘোষিত ডলারের দর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে ডলারের স্পট বিক্রয়মূল্য ছিল ১২৫ টাকা এবং ক্রয়মূল্য ছিল ১২৪ টাকা। অথচ মাত্র কয়েক দিন আগে গত ২৭ অক্টোবর এই ব্যাংকে বিক্রয়মূল্য ছিল ১২৪ টাকা এবং ক্রয়মূল্য ছিল ১২৩ টাকা। অন্যান্য ব্যাংকের চিত্রও প্রায় একই রকম। সোনালী ব্যাংকে এদিন ডলারের ক্রয়মূল্য ছিল ১২৩ টাকা ৭০ পয়সা এবং বিক্রয়মূল্য ছিল ১২৪ টাকা ৭০ পয়সা। বেসরকারি খাতের ইস্টার্ন ব্যাংকে ডলারের বিক্রয়মূল্য ১২৪ টাকা ৬০ পয়সা এবং ক্রয়মূল্য ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা নির্ধারিত ছিল। একইভাবে সিটি ব্যাংক প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৪০ পয়সায় কিনে ১২৪ টাকা ৬০ পয়সায় বিক্রি করেছে এবং ব্র্যাক ব্যাংকেও ডলারের ক্রয়মূল্য ছিল ১২৩ টাকা ৬০ পয়সা ও বিক্রয়মূল্য ১২৪ টাকা ৬০ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের গড় বিনিময় হার বেড়ে ১২৪ টাকা ৩৫ পয়সায় দাঁড়িয়েছে, যা বাজারের সামগ্রিক অস্থিরতারই প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ একটি স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে মাসের শেষ দিকে যখন বড় ধরনের পেমেন্টগুলো পরিশোধ করতে হয়, তখন ডলারের চাহিদাও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি রমজান মাসের চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই এলসি খোলা শুরু করেছেন। রমজানে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানিকারকরা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যার ফলে বাজারে ডলারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ সাময়িক এবং বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
ডলারের বিনিময় হারে এই হঠাৎ উল্লম্ফনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। গত সোমবার সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের বা এমডিদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ব্যাংক নির্বাহীদের সতর্ক করে দিয়েছেন। বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বর্তমানে দেশের অধিকাংশ ব্যাংকের ডলার ধারণক্ষমতা বা নিট ওপেন পজিশন (এনওপি) বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে এবং বাজারে ডলারের সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি নেই। গভর্নর স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ব্যাংকগুলোর এনওপি ইতিবাচক থাকার পরেও ডলারের দাম এত বেশি হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা ব্যাংক যাতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ডলারের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, ডলারের প্রবাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও দাম বেড়ে যাওয়াটা বাজারের জন্য নেতিবাচক সংকেত, তাই ব্যাংকগুলোকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডলারের দাম ১২৫ টাকায় উঠে যাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ আমদানিকৃত পণ্যের দাম সরাসরি ডলারের দরের ওপর নির্ভরশীল। যদি ডলারের দাম এভাবে বাড়তে থাকে, তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ এবং ব্যাংকগুলোর এলসি খোলার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকলে বাজার দ্রুত স্থিতিশীল হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে যাতে তারা ডলারের প্রকৃত চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে দর নির্ধারণ করে এবং কোনোভাবেই যেন অতি মুনাফার লোভে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করা হয়। সামনের দিনগুলোতে ডলারের বাজার কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি এবং বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির ওপর।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!