শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ / রাত ১০:৫২ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে আলোচনায় ভারত

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে আলোচনায় ভারত
মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ঘিরে আলোচনায় ভারত

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে জাপানের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক এই পর...

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। গত মাসের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের টোকিও সফরে দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে জাপানের ‘বিগ-বি’ উদ্যোগ। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক এই পরিকল্পনার লক্ষ্য মাতারবাড়িকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা।

তবে নতুন করে এই উদ্যোগ আলোচনায় আসার পর কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। যৌথ ঘোষণায় আঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়েছে মুক্ত ও স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের কথা।

ফলে এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত বিশেষ কোনো সুবিধা পাবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দলটির আশঙ্কা, কানেক্টিভিটির নামে ভারতকে কোনো করিডোর বা পণ্য পরিবহনের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না।

যদিও সরকার বলছে, এমন কোনো উদ্দেশ্য নেই। বরং মাতারবাড়িকে বাংলাদেশের রপ্তানি ও শিল্পায়নের বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় তারা। কিন্তু মাতারবাড়িতে আসলে কী হচ্ছে।

কীভাবে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে গভীর সমুদ্রবন্দরের ধারণা এল। এই প্রকল্পে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন কেন উঠছে। আর ভারত, চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে বাংলাদেশ কীভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে পারে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা থেকে গভীর সমুদ্রবন্দর। মাতারবাড়ি কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার সমুদ্রতীরবর্তী একটি ইউনিয়ন। সেখানে প্রথমে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে।

২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ বিষয়ে চুক্তি হয়। প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি সরাসরি সমুদ্রের তীরে নির্মাণ না করে সমুদ্র থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার ভেতরে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কয়লা আমদানি ও পরিবহনের জন্য প্রয়োজন ছিল নৌ-চ্যানেল। এ কারণে সমুদ্রের তীর থেকে মাটি খনন করে ২৫০ মিটার প্রশস্ত ও ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি চ্যানেল তৈরির কাজ শুরু হয়। তবে ২০১৭ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) একটি প্রাক্‌-সমীক্ষা চালিয়ে নতুন প্রস্তাব দেয়।

সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তৈরি করা চ্যানেলে সামান্য পরিবর্তন এনে এর দক্ষিণ পাশে একটি বাণিজ্যিক বন্দর নির্মাণ করা সম্ভব। জাইকার যুক্তি ছিল, একই চ্যানেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা পরিবহন এবং বাণিজ্যিক বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে অবকাঠামো নির্মাণের ব্যয়ও কমবে।

বাংলাদেশ পরে এ প্রস্তাব গ্রহণ করে। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য তৈরি করা নৌ-চ্যানেলকে ঘিরেই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে যায়। বন্দরের প্রয়োজন অনুযায়ী চ্যানেলের গভীরতা ও প্রশস্ততাও বাড়ানো হয়।

এখন এই গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানিই নয়, উৎপাদন ও শিল্পকারখানার একটি বড় কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিগ-বি উদ্যোগে মাতারবাড়িতে কী হচ্ছে। বিগ-বির পূর্ণ নাম ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ’।

বঙ্গোপসাগর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম এলাকায় জাপানের এই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। এ জন্য শুধু বন্দর নির্মাণ নয়, পণ্য পরিবহনের জন্য সড়ক, রেল ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রায় এক দশক ধরে এ উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে জাপান। এই পরিকল্পনার আওতায় মাতারবাড়িতে ইতিমধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। সেখানে আরেকটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলছে।

ভবিষ্যতে এলএনজি টার্মিনাল, গভীর সমুদ্রবন্দর ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। জাপান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যৌথ ঘোষণায় বিগ-বি উদ্যোগের চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা।

দ্বিতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো। তৃতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ উদ্যোগের আওতায় আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি জাপানি বিনিয়োগ আসার কথা রয়েছে।

চতুর্থত, শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা বাড়ানো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পাবে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বিবিসি বাংলাকে বলেন, মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার।

তিনি বলেন, ‘মাতারবাড়িতে আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর। এরপর একে কেন্দ্র করে জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা। সেখানে আমরা পরিকল্পিত নগরও গড়ে তুলছি, যাতে এটি বৈশ্বিক রপ্তানি কেন্দ্র হতে পারে।

তিতুমীর আরো বলেন, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে শুরু করে আফ্রিকা পর্যন্ত বিভিন্ন বাজারে মাতারবাড়ির পণ্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে। বিনিয়োগ আসবে জাপান থেকে, ঋণ শোধ করতে হবে বাংলাদেশকে। মাতারবাড়িকে বৈশ্বিক রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, শিল্পকারখানা, গভীর সমুদ্রবন্দর এবং যোগাযোগব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এসব প্রকল্পে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। এর বড় অংশের অর্থায়ন করবে জাপান। তবে এই অর্থের ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিতে হবে বাংলাদেশকে।

এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, জাপানের বিপুল বিনিয়োগ থেকে বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত কতটা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিবিসি বাংলাকে বলেন, মাতারবাড়ি প্রকল্প থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তিনি জানান, পুরো এলাকায় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মধ্যে ৪৮ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার আসতে পারে বেসরকারি খাত থেকে। এসব বিনিয়োগের বড় অংশ নিয়ে আসবেন জাপানি বিনিয়োগকারীরা। গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, জাপানের মতো বড় বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এলে শুধু অর্থ বা পণ্যই আসবে না, সঙ্গে আসবে প্রযুক্তিও।

এতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও উৎসাহিত হবেন। তাঁরা জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ব্যবসা করার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠবে।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, পুরো প্রকল্প এলাকায় কয়েক দশক ধরে প্রায় ২৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মাতারবাড়ি প্রকল্পের সঙ্গে ভারতের সম্পৃক্ততার বিষয়টি নতুন নয়। শুরু থেকেই বিগ-বি উদ্যোগের পরিকল্পনায় ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে মাতারবাড়ি প্রকল্প নিয়ে চুক্তি হয়। তখন জাপানের পরিকল্পনায় বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে একটি বড় বাজার গড়ে তোলার ধারণা ছিল। ২০১৪ সালের মে মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের সময় দেশটির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে প্রথম বিগ-বি উদ্যোগের ধারণা সামনে আনেন।

এরপর একই বছরের জুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে এক অনুষ্ঠানে বিগ-বির আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আকিহিকো তানাকা। তিনি বলেছিলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকে কেন্দ্র করে শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারই এই উদ্যোগের মূল ভিত্তি। এর দ্বিতীয় ভিত্তি জ্বালানি এবং তৃতীয় ভিত্তি পরিবহনব্যবস্থা।

অর্থাৎ মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনা এবং প্রতিবেশী দেশগুলো পর্যন্ত পরিবহনব্যবস্থা সম্প্রসারণের বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে শেখ হাসিনা ঢাকায় মাতারবাড়িকে ঘিরে বিস্তৃত পরিকল্পনার ঘোষণা দেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা হিসেবেও এটি গ্রহণ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার ভারত সফরের সময় বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব সামনে আসে। অর্থাৎ বিগ-বি উদ্যোগের পরিকল্পনা এবং মাতারবাড়ি প্রকল্পের শুরু থেকেই ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

তবে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি আসার পরও প্রকল্পটির ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দুই দেশ বিগ-বি উদ্যোগকে আরও উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। যৌথ ঘোষণায় সরাসরি ভারত বা অন্য কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

তবে সেখানে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মাতারবাড়িকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। ফলে এই প্রকল্প যে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা স্পষ্ট। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে ভারতের বিষয়টি সামনে আসছে।

এ কারণেই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতকে বিশেষ যোগাযোগ বা পণ্য পরিবহনের সুবিধা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ভারত একটি স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় এ বিতর্ক আরও গুরুত্ব পেয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর ঢাকায় এক সমাবেশে ভারতের নাম সরাসরি উল্লেখ না করেই মাতারবাড়ি প্রকল্পে কানেক্টিভিটির নামে দেশটিকে সুবিধা দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে জামায়াতে ইসলামী।

দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে কোনো লোকচুরি হচ্ছে কি না, জাতি তা পরিষ্কার জানতে চায়। কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে কারও কাছে ইজারা দেওয়া চলবে না। তবে মাতারবাড়িতে যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে জামায়াতের উদ্বেগের সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে চেয়েছিল বিবিসি বাংলা।

এ বিষয়ে দলটির পক্ষ থেকে নতুন করে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবিসিকে বলেন, জাপানের সঙ্গে যৌথ ঘোষণা এবং চুক্তিগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে পরে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেবে তাঁর দল। তবে জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তাদের উদ্বেগের একটি দিক স্পষ্ট হয়েছে।

সেটি হলো, মাতারবাড়ি প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত করিডোর বা পণ্য এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে নেওয়ার সুবিধা পাবে কি না। সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বিবিসিকে বলেন, বিগ-বির অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ভালো। তবে ভারতকে এ প্রকল্পের মাধ্যমে কোনো সুবিধা দিতে হলে তার আগে বাংলাদেশের ভেতরে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলে একটি সমন্বিত বাজার তৈরির অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য দরকার, তা এখনো তৈরি হয়নি। সাকিব আলী বলেন, ‘যদি রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়, তাহলে আমরা অর্থনৈতিক একীভূতকরণের দিকে যেতে পারি।

আর যদি রাজনৈতিক সমঝোতা না করি, তাহলে আমি মনে করি, আমরা বিরাট সমস্যার মধ্যে পড়ব এবং এটি বাস্তবায়িত হবে না। ভারতের পাশাপাশি চীনকে নিয়েও ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন। মাতারবাড়ি প্রকল্প ঘিরে উদ্বেগ শুধু ভারতকে নিয়ে নয়।

এ উদ্যোগকে চীন কীভাবে দেখবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ, বাংলাদেশ ও জাপানের যৌথ ঘোষণায় মুক্ত ও স্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের কথা বলা হয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল মূলত যুক্তরাষ্ট্রের একটি উদ্যোগ।

চীন এই কৌশলকে এ অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব সীমিত করা এবং দেশটিকে ঘিরে ফেলার মার্কিন প্রচেষ্টা হিসেবে দেখে। অন্যদিকে জাপান ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অর্থনীতিবিদ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিগ-বি উদ্যোগে জাপান ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছে।

পর্যায়ক্রমে এ উদ্যোগের সঙ্গে এ অঞ্চলের আরও দেশকে যুক্ত করার পরিকল্পনা থাকতে পারে। তিনি বলেন, এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিষয়ও জড়িত। জাপান পুরো অঞ্চলকে ঘিরে কাজ করছে।

এর একটি উদ্দেশ্য হলো, বড় শক্তিগুলোর প্রভাববলয়ের বাইরে রেখে অঞ্চলটিকে জাপানি বিনিয়োগের উপযোগী অর্থনৈতিক এলাকায় পরিণত করা। এ ছাড়া বাংলাদেশে চীনের প্রভাব কমাতে জাপান দেশটিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে—এমন ধারণাও রয়েছে। ফলে এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।

খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা। চীনের বিনিয়োগ ও দেশটির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে ভারতের বড় বাজারকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের বিনিয়োগের সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।

ঠিক একইভাবে আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে ভারতের বড় বাজারকেও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তার মতে, কোনো একটি জোটের সঙ্গে অতিরিক্ত রাজনৈতিকভাবে যুক্ত না হয়ে চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। এ দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে কীভাবে সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়া যায়, সে কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।

একই ধরনের মত দিয়েছেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী। তাঁর মতে, বাংলাদেশকে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে জাপানের সঙ্গেও থাকতে হবে।

আমেরিকার সঙ্গেও থাকতে হবে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। এটা বলা যতটা সহজ, করা ততটা সহজ নয়।

কিন্তু আমার মনে হয়, এটাই পথ। সব দেশের জন্য মাতারবাড়ি উন্মুক্ত রাখার কথা সরকারের। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবে, সে প্রশ্নে সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছিল বিবিসি বাংলা।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকার সব দেশের বিনিয়োগকেই স্বাগত জানাতে আগ্রহী। সে অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগও আসছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, চীনের বিনিয়োগে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ হচ্ছে।

চট্টগ্রাম এলাকায় মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগও রয়েছে। তিতুমীর বলেন, মাতারবাড়ি কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। সব দেশের জন্যই বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত থাকবে।

তিনি বলেন, ‘এটা সবার জন্যই উন্মুক্ত। আমাদের সঙ্গে যে কেউ বিনিয়োগের প্রস্তাব দিতে পারে। প্রস্তাবের যৌক্তিক ভিত্তি এবং বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনা করে সেগুলো গ্রহণ করা হবে।

সব মিলিয়ে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে বিপুল ঋণ ও বিনিয়োগের সুফল নিশ্চিত করা, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি এবং চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।

সূত্র: আমার দেশ

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

জাতীয়

' ' আমেরিকা

Image source, AFP via Getty ImagesBySarah Rainsford, Southern and Eastern Europe correspondent and Victoria BournePublished7 Novem...

জাতীয়

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির তথ্য দিলেই ২ কোটি ডলার দেবে যুক্তরাষ্ট্র

এই কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা, প্রযুক্তি, সক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পরর...

জাতীয়

পেট্রাপোলে আমদানি-রফতানি বন্ধ

জাতীয় বিপøব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দরে সব ধরনের আমদানি-রফতানি বন্ধ রয়েছে। তবে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চলাচল স্বা...

জাতীয়

খুলনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি

খুলনায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি দিয়ে ঢেকে দিয়েছে অজ্ঞাতরা।‎‎‎ একই দেয়ালে দেখা গেছে রবীন্দ্রনাথবিরোধী কয়েকট...

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV