শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ / রাত ১০:৪৭ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়ব্রেকিং

দিনে ৮০০ টাকার কমে সংসার চলে না

দিনে ৮০০ টাকার কমে সংসার চলে না
দিনে ৮০০ টাকার কমে সংসার চলে না

মাথার বেশির ভাগ চুল পেকে সাদা, হালকা মোচ-দাড়িরও একই দশা। কপালে বলিরেখা, চোখ দুটি সামান্য কোটরে ঢোকা। মুখে হাসি লেগে থাকে; কিন্তু চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া। নাম সুকুমার রবিদাস, বয়স ৫০ পেরিয়েছে। থাকেন ফরিদপুর শহরের রবিদাস পল্লিতে। প্রায় ৪০ বছর ধরে জুতা-স্যান্ডেল বানান; পুরোনো ...

মাথার বেশির ভাগ চুল পেকে সাদা, হালকা মোচ-দাড়িরও একই দশা। কপালে বলিরেখা, চোখ দুটি সামান্য কোটরে ঢোকা। মুখে হাসি লেগে থাকে; কিন্তু চোখে অনিশ্চয়তার ছায়া।

 নাম সুকুমার রবিদাস, বয়স ৫০ পেরিয়েছে। থাকেন ফরিদপুর শহরের রবিদাস পল্লিতে। প্রায় ৪০ বছর ধরে জুতা-স্যান্ডেল বানান; পুরোনো ছেঁড়া জুতা সেলাই ও মেরামত করেন, রং করেন, পলিশ করেন।

বসেন শহরের কুমার নদের পাড়ে ময়রাপট্টিতে, একটি স্যানিটারি পণে৵র দোকানের সামনে রাস্তার ধারে। একই কাজ করতেন তাঁর বাবা ও দাদা। সুকুমার কাজ শিখেছেন বাবার কাছে, বাবা শিখেছিলেন তাঁর বাবার কাছে।

এভাবেই চলছে বংশপরম্পরায়।  .রাস্তার ধারে সেই জায়গাতেই একদিন সুকুমারের সঙ্গে আলাপ হলো। সকাল ১০টার দিকে কাজে বসেন, বাড়ি ফেরেন রাতে।

মাঝখানে একবার বাড়ি গিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আসেন। বলেন, ‘আয়রোজগার ভালো না। কোনো দিন ৫০০ হয়, কোনো দিন ৩০০।

কোনো কোনো দিন আরও কম। সংসার চলে কি চলে না...। ’ চার সদস্যের সংসার সুকুমারের।

স্ত্রী শোভারানী রবিদাস গৃহিণী। মেয়ে টুম্পা এসএসসি পাস করেছে, ছেলে মনোজ পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে। উপার্জন করেন সুকুমার একাই।

তিনি জানান, এমন টানাপোড়েন তাঁর একার নয়; তাঁর পেশার প্রায় সবারই একই দশা।  .মেশিনের জুতায় ভরা বাজারএকসময় এই পেশার মানুষদের এতটা দুর্দশা ছিল না। সুকুমার বলেন, ‘আগে হাতে বানানো জুতা-স্যান্ডেলের কদর ছিল।

প্রতি মাসে মানুষ বায়না দিয়ে ৫-১০ ডজন জুতা-স্যান্ডেল বানিয়ে নিত; কিন্তু এখন মেশিনে তৈরি জুতা-স্যান্ডেলে বাজার ভরে গেছে...। ’ এখন মাসে ১৮–২০ জোড়ার বায়না পান। তবে বায়না দেওয়া মানুষ সবাই জুতা নিতে আসেন না; কেউ কেউ বায়না দিয়ে আর খোঁজই নেন না।

ফলে প্রতি মাসে কয়েক জোড়া জুতা পড়ে থাকে। সেগুলো অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রির চেষ্টা করেন। কিছু বিক্রি হয়, কিছু দীর্ঘদিন অবিক্রীত থাকে।

 সুকুমারের হিসাবে, প্রতি জোড়ায় লাভ থাকে ১০০ টাকার মতো; জুতা বানিয়ে মাসে আয় হয় হাজার দুয়েক টাকা। মূল আয় আসে পুরোনো জুতা মেরামত আর রং-পলিশ থেকে, মাসে ১৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মাসে ১৭ হাজার টাকার মতো।

অথচ তাঁর কথায়—একদম গরিবি হালে চললেও দিনে ৮০০ টাকার কমে সংসার চলে না। তাই ধারদেনা করতে হয়, মুদিদোকানে বাকি পড়ে। তাঁদের একটি সমিতি আছে।

সেখান থেকে ঋণ নেন, সপ্তাহে সপ্তাহে কিস্তি দিয়ে শোধ করেন। সুকুমারের ভাষায়, তিনি ঋণের চক্রে বাঁধা পড়ে আছেন।  .ময়রাপট্টিতে এখন চারজনরোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাস্তার ধারেই বসতে হয় সুকুমারকে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষেরা এভাবে কাজ করে এসেছে, আমরাও এভাবেই কাজ করে যাচ্ছি; কিন্তু রাস্তার পাশে বসে কাজ করতে খারাপ লাগে। অবশ্য কাজের জায়গা দিতে হবে, এমন দাবি কোনো দিন জানাই নাই। আমাদের বাবা-দাদারাও জানাইছে বলে শুনি নাই।

’ এই পেশায় মানুষও কমছে। সুকুমার বলেন, ‘এখনকার ছেলেরা এ পেশায় আসতে চায় না। এই কাজ শেখার ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ দেখি না।

তারা কেউ সেলুনে কাজ করে, কেউ মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে কাজ করে। অথচ পাকিস্তান আমলে এই ময়রাপট্টিতেই আমাদের পেশার ২০-২৫ জন বসতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও অনেক দিন পর্যন্ত সংখ্যাটা মোটামুটি ওই রকমই ছিল; কিন্তু দিনে দিনে অনেকে মরে গেছে।

এখন আমরা এ পাড়ায় আছি মাত্র চারজন। ’ নিজের ছেলে এই পেশায় আসুক, তা সুকুমার চান না। ছেলেও বাপ-দাদার পেশায় আসতে চায় না।

তাহলে পেশার মানুষ কমে যাওয়ায় আফসোস কেন। সুকুমারের উত্তর—আফসোস নেই। মানুষ কমলেও পেশাটা কোনো দিন একেবারে ফুরিয়ে যাবে না।

তাঁর কথায়, ‘আমাদের সম্প্রদায় যত দিন আছে, তত দিন এই পেশা থাকবে। সবাই তো ছেলেদের লেখাপড়া করাতে পারে না, যারা লেখাপড়া করে না, তারা এই পেশাতেই আসবে। ’ .দাঁতে দাঁত চেপে টিকে থাকারবিদাস পল্লিতে সুকুমারের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল মাটির ভিটা, টিনের চাল আর টিনের বেড়ার জরাজীর্ণ ছোট একটি ঘর।

সেখানেই স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন তিনি। ঘরের এক কোণে রান্নার জায়গা। শৌচাগার বারোয়ারি, যেতে হয় ঘর থেকে একটু দূরে।

 রবিদাস পল্লিতে মোট ৪৭টি পরিবারের বাস। এই বসতি টিকিয়ে রাখতেও লড়তে হয়েছে। সুকুমার জানান, একসময় তাঁরা হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজারে নিজেদের রেকর্ড করা জায়গায় থাকতেন।

১৯৬৫ সালে সরকার সেই জায়গা অধিগ্রহণ করে তাঁদের এখানে থাকতে দেয়। এখানকার কিছু জমি সরকারি খাস খতিয়ানেও ছিল। সুকুমারের ভাষ্য, ২০১২ সালে উচ্ছেদ অভিযানে তাঁর ঘরসহ ১৩টি ঘর ভেঙে দেওয়া হয় পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই।

তিনি বলেন, ‘তবে ওই জায়গা আমরা ছেড়ে দিইনি। দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে ছিলাম। মামলা-মোকদ্দমা করে জজকোর্ট থেকে আমরা বসবাসের সুযোগ পাই।

’ যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা দারিদ্র্য আর বঞ্চনা থেকে বেরিয়ে আসতে চান সুকুমার। তাঁর বিশ্বাস, এ ক্ষেত্রে সরকারই তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারে।  .নিজের আনন্দে রাত জাগাএত টানাপোড়েনের মধ্যেও নিজের কাজটাকে ভালোবাসেন সুকুমার।

নতুন এক জোড়া জুতা বানানো তাঁর কাছে আনন্দের কাজ। তিনি বলেন, ‘এই কাজ খুব মন দিয়ে করতে হয়। বাড়িতে বসে কাজ করি, কোন দিক দিয়ে সময় চলে যায় টেরই পাই না; কখনো কখনো রাতের একটা-দুটো বেজে যায়।

কখনো কখনো এমনও হয়—অর্ডার নাই, তবু নিজের আনন্দে রাত জেগে জুতা বানাচ্ছি। বিক্রি করতে পারব কি না, সেই চিন্তা মাথাতেই নাই...। ’প্রবীর কান্তি বালানিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, ফরিদপুর।

সূত্র: প্রথম আলো

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

জাতীয়

এইচএসসির ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন শেষ আজ, মানতে হবে যে যে নিয়ম

২০২৬ সালে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের (খাতা চ্যালেঞ্জ) আবেদন শেষ হচ্ছে আজ শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬)। ...

জাতীয়

নিউজিল্যান্ড’ -

xwhatsapp-strokecopylinkgoogleAdd Al Jazeera on Googleinfo(Al Jazeera)By ReutersPublished On 7 Nov 20267 Nov 2026New Zealand’s gov...

জাতীয়

৭ নভেম্বর উপলক্ষে শোভাযাত্রা, নয়াপল্টনে বিএনপি নেতাকর্মীদের ভিড়

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপির বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বাড়ছে.....

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV