বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ‘আদিবাসী’ শব্দের ব্যবহার এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বর্তমানে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবী মহলে এই শব্দের যথেচ্ছ প্রয়োগ লক্ষ করা যাচ্ছে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। একদিকে যেমন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবি তোলা হচ্ছে, অন্যদিকে পাহাড়ের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী যারা বাঙালি, তাদের ‘সেটেলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সভা-সেমিনার এবং পোস্টারের মাধ্যমে এই দাবিগুলোকে জোরালো করার চেষ্টা চলছে, যা পাহাড়ের দীর্ঘদিনের জাতিগত ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবিও নতুন করে সামনে আনা হচ্ছে, যা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের আমলে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির পর থেকে এ পর্যন্ত ২৩৮টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে ক্যাম্প প্রত্যাহারের ফলে পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসার পরিবর্তে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে পাহাড়ে সক্রিয় একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ঘটাচ্ছে। এই পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন পাহাড়ের সাধারণ বাঙালি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই। শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পার হলেও পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার পেছনে চুক্তির অসামঞ্জস্যতা এবং আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাকে দায়ী করা হচ্ছে। চুক্তিতে পাহাড়ের বিশাল এক জনগোষ্ঠী বাঙালির স্বার্থ যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার ও প্রচারণার ক্ষেত্রেও একপাক্ষিক চিত্র তুলে ধরার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২৭ বছর আগে নিখোঁজ হওয়া কল্পনা চাকমার ঘটনাকে বারবার সামনে আনা হলেও, শান্তি বাহিনীর হাতে পাহাড়ে নিহত প্রায় ৩০ হাজার বাঙালির আত্মত্যাগের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে কল্পনা চাকমার নামে দেয়ালচিত্র দেখা গেলেও, শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরার মতো ব্যক্তিদের বিচার দাবিতে তেমন কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। ওমর ফারুক ত্রিপুরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পাহাড়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তথাকথিত আদিবাসী পরিচয়ের আড়ালে বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চলছে, যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাহাড়ে খ্রিষ্টান মিশনারিদের কার্যক্রম নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, বিভিন্ন প্রলোভন ও কৌশলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষকে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো একটি নতুন খ্রিষ্টান রাষ্ট্র গঠনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা থাকতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মিশনারিদের এই তৎপরতা পাহাড়ের বিদ্যমান সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে এবং দেশের অখণ্ডতার প্রতি হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশের কিছু বামপন্থি রাজনৈতিক শক্তি এবং বুদ্ধিজীবী মহলও না বুঝে বা বিশেষ উদ্দেশ্যে এই প্রচারণায় ইন্ধন জোগাচ্ছেন বলে মনে করা হয়।
নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘আদিবাসী’ বা ‘Aboriginal’ শব্দের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। উত্তর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরিরা ঐতিহাসিকভাবে তাদের ভূখণ্ডের আদি অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাদের পূর্বপুরুষেরা বিভিন্ন সময়ে তিব্বত, লুসাই পাহাড়, চীন, কাচিন এবং বার্মা থেকে এই অঞ্চলে অভিবাসিত হয়েছেন। কয়েকশ বছর ধরে বসবাস করলেই কোনো জনগোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় ‘আদিবাসী’ বলা যায় কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যদি কয়েক প্রজন্ম পর নিজেদের ওই অঞ্চলের আদিবাসী দাবি করে, তবে তা যেমন অযৌক্তিক হবে, পাহাড়ের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য হতে পারে। তাই আবেগের বশবর্তী না হয়ে ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক বাস্তবতার নিরিখে এই পরিচয় নির্ধারণ করা জরুরি।
পরিশেষে, পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ন্যায্য অধিকার রক্ষার পাশাপাশি পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালিদের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শান্তিচুক্তির সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনে তা সংশোধন করতে হবে এবং সব ধরনের সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাহাড়ের সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল একটি সমৃদ্ধ ও নিরাপদ পার্বত্য চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!