জার্মানিতে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচি চরম সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। শনিবার রাতে দেশটির আর্থিক কেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্টসহ বার্লিন, হামবুর্গ ও কোলন শহরে বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ ও দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। মূলত তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলনটি দিনের শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও রাতের আঁধারে তা সংঘাতময় হয়ে ওঠে। পুলিশ জানিয়েছে, ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান বাণিজ্যিক এলাকায় বিক্ষোভকারীরা জরুরি সেবা প্রদানকারী কর্মীদের লক্ষ্য করে আতশবাজি, পাথর এবং বোতল নিক্ষেপ করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে জলকামান ব্যবহার করতে হয়েছে। এই অস্থিরতা কেবল জার্মানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে, যা মহাদেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিক্ষোভের মূল আয়োজক ছিল ‘জেন জি রেজেল্ট’ বা ‘জেন জি টেকস চার্জ’ নামক একটি প্রচার গোষ্ঠী। তারা মূলত স্কুলে অর্থায়নের অভাব, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, জনসেবা খাতে বাজেট কর্তন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল। ফ্রাঙ্কফুর্ট, মিউনিখ এবং বার্লিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে প্রায় ১৮ হাজার মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন, যদিও আয়োজকদের দাবি ছিল এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। জেন জি রেজেল্ট-এর মুখপাত্র লিনা ফ্রেডরিখ বলেন যে, তাদের এই লড়াই শান্তি ও স্বাধীনতার জন্য, কোনো যুদ্ধ বা জবরদস্তির বিরুদ্ধে নয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামরিক পরিষেবার বাধ্যবাধকতা বাতিল করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। তবে শান্তিপূর্ণ এই দাবির আড়ালে চরমপন্থী অনুপ্রবেশের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
শনিবার রাতে ফ্রাঙ্কফুর্টের রাজপথে ভয়াবহ দৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। বিক্ষোভকারীরা বেশ কিছু দোকানের জানালার কাঁচ ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে এবং জুতোসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে। এমনকি একটি অস্ত্রের দোকানেও হামলা চালানো হয় এবং সেখান থেকে পুলিশ দুটি অস্ত্র উদ্ধারসহ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। হেস রাজ্যের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী রোমান পোসেক জানিয়েছেন যে, প্রায় ১০০ জন চিহ্নিত বামপন্থী চরমপন্থী এই বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করেছিল এবং তাদের কারণেই এই ন্যাক্কারজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ফ্রান্সের সাম্প্রতিক দাঙ্গার উদাহরণ টেনে বলেন যে, ফ্রাঙ্কফুর্ট বা জার্মানির অন্য কোনো শহরকে ফ্রান্সের মতো জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। ফ্রাঙ্কফুর্ট পুলিশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশেষ পুলিশ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছিল এবং বেশ কিছু মলোটভ ককটেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছে।
জার্মানির অন্যান্য শহরগুলোতেও একই ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। বার্লিনে সন্ধ্যার পর ছোটখাটো সংঘর্ষে অন্তত ২৭ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং ৫৬ জনকে সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে। হামবুর্গে কালো পোশাক পরিহিত একদল বিক্ষোভকারী রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং আতশবাজি ফাটায়। সেখানে প্রায় ১২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যম এনডিআর জানিয়েছে। কোলন শহরে প্রধান রেলস্টেশনের কাছে পুলিশের ওপর বোতল ও সাইকেল ছুড়ে হামলা চালানো হয়। কোলনের পুলিশ প্রধান জোহানেস হারমানস এই ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে, তরুণদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে চরমপন্থীরা নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। জার্মানির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট বিল্ড পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্যারিসের মতো বড় ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছে এবং দাঙ্গাকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
ইউরোপের অন্যান্য প্রান্তেও একই ধরনের বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল জনসেবার প্রতিবাদে টানা তৃতীয় সপ্তাহের মতো প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। প্যারিস, তুলুজ, লিওন এবং মার্সেইতে পুলিশের সাথে বিক্ষোভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে এবং ৫ শতাধিক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পর্তুগালে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন, যেখানে গত এক দশকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ইতালি, বেলজিয়াম, আয়ারল্যান্ড, স্পেন এবং গ্রিসসহ ইউরোপের অন্তত ১০টি দেশে তরুণরা বর্তমানে রাজপথে অবস্থান করছে। যদিও দেশভেদে তাদের দাবি ভিন্ন, তবে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, শিক্ষা এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা চাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন সুর লক্ষ্য করা গেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সরকার এখন এই ক্রমবর্ধমান জনরোষ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!