রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক চাঞ্চল্যকর অভিযানে প্রায় ৫ কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণের ডিম জব্দ করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)। গত ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে পরিচালিত পৃথক দুটি অভিযানে মোট ২ কেজি ৭২৮ গ্রাম ওজনের ৬টি স্বর্ণের ডিম উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এই ঘটনার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এই স্বর্ণগুলো এর আগে অবৈধভাবে আবুধাবি থেকে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল, কিন্তু স্থানীয় বাজারে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করতে না পেরে চোরাচালান চক্রটি পুনরায় সেগুলো আবুধাবিতে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছিল। কাস্টমস গোয়েন্দাদের কাছে আসা একটি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয় এবং এর মাধ্যমে স্বর্ণ চোরাচালানের একটি নতুন ও অভিনব কৌশলের বিষয়টি সামনে এসেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, ওই দিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে আবুধাবির উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-১২৭ ফ্লাইটের যাত্রী মোহাম্মদ মিনহাজকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাকে উড়োজাহাজ থেকে অফলোড করে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। পরবর্তীতে তার দেহ তল্লাশি করে এবং বিশেষ কৌশলে লুকানো ৩টি স্বর্ণের ডিম উদ্ধার করা হয়। এই ৩টি ডিমের মোট ওজন ছিল ১ কেজি ৩৬৪ গ্রাম। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিনহাজ স্বীকার করেন যে, তিনি এই স্বর্ণগুলো পুনরায় বিদেশে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজ এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় আরও ৩টি স্বর্ণের ডিম উদ্ধার করেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া এই ৩টি ডিমের ওজনও ছিল ১ কেজি ৩৬৪ গ্রাম। অর্থাৎ দুটি পৃথক ঘটনায় মোট ৬টি স্বর্ণের ডিম জব্দ করা হয় যার মোট ওজন দাঁড়িয়েছে ২ কেজি ৭২৮ গ্রাম।
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন যে, এই স্বর্ণের ডিমগুলো এর আগে কোনো এক সময় আবুধাবি থেকে অবৈধ পথে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। চোরাচালান চক্রের পরিকল্পনা ছিল দেশের বাজারে উচ্চমূল্যে এই স্বর্ণ বিক্রি করে বিপুল মুনাফা অর্জন করা। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বা অন্য কোনো কারণে তারা বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছিল না। ফলে লোকসান এড়াতে বা পুনরায় অন্য কোনো আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে সেগুলো আবুধাবিতে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সাধারণত বিদেশ থেকে বাংলাদেশে স্বর্ণ চোরাচালানের ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও, বাংলাদেশ থেকে পুনরায় বিদেশে স্বর্ণ ফেরত পাঠানোর এই ঘটনাটি কাস্টমস কর্মকর্তাদের বিস্মিত করেছে। এটি একটি নতুন ধরনের অপরাধ প্রবণতা হিসেবে দেখা হচ্ছে যেখানে চোরাকারবারিরা বাজারের চাহিদা ও মূল্যের ওপর ভিত্তি করে তাদের রুট পরিবর্তন করছে।
স্বর্ণ চোরাচালানের এই ব্যতিক্রমী ও অভিনব ঘটনায় দেশের বিমানবন্দরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে নানা প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এখন স্বর্ণের প্রকৃত উৎস এবং এর পেছনে থাকা মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে কাজ করছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই চক্রের সঙ্গে কোনো আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয় রয়েছে কি না, তাও নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখছেন। জব্দকৃত স্বর্ণের ডিমগুলো বর্তমানে কাস্টমসের গুদামে জমা রাখা হয়েছে এবং আটককৃত যাত্রী মোহাম্মদ মিনহাজের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই ঘটনার পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা এবং নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের অভিনব উপায়ে কোনো অবৈধ পণ্য পাচার হতে না পারে। কাস্টমস কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই চক্রের সাথে আরও অনেকেই জড়িত থাকতে পারে এবং তদন্তের মাধ্যমে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
পুরো ঘটনাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, বিষয়টির গতিপ্রকৃতি নীতিনির্ধারক ও সাধারণ পাঠকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঘটনার সূত্রপাত থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এ সংক্রান্ত পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য ও অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করা হচ্ছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!