সংবাদ

ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় পরমশূন্য শীতল বস্তু রাখলে কী ঘটবে: থার্মোডাইনামিকসের নিয়ম, জমাট বাতাস ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির রহস্য উন্মোচন

ঘরের সাধারণ তাপমাত্রায় পরমশূন্য শীতল বস্তু রাখলে কী ঘটবে: থার্মোডাইনামিকসের নিয়ম, জমাট বাতাস ও কোয়ান্টাম প্রযুক্তির রহস্য উন্মোচন

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক: পদার্থবিজ্ঞানের চিরায়ত নিয়মে তাপ ও শীতলতার একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে, যার চরম প্রান্তকে সংজ্ঞায়িত করা হয় পরমশূন্য তাপমাত্রা বা অ্যাবসলিউট জিরো হিসেবে। আধুনিক তাত্ত্বিক ও ফলিত পদার্থবিজ্ঞান অনুসারে শূন্য কেলভিন বা মাইনাস ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলো এই মহাবিশ্বের সর্বনিম্ন সম্ভাব্য শীতলতম বিন্দু, যার নিচে তাপমাত্রা নামানো প্রাকৃতিক নিয়মে অসম্ভব। যদি কোনো গবেষণাগারে তরল হিলিয়াম ব্যবহার করে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এক কিলোগ্রাম ওজনের একখণ্ড ধাতব তামাকে মাত্র ৪ কেলভিন বা প্রায় মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় শীতল করার পর তা হঠাৎ ঘরের সাধারণ তাপমাত্রার একটি খাবার টেবিলের ওপর রেখে দেওয়া হয়, তবে ঠিক কী ঘটবে? কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রগুলোর রোমাঞ্চকর দৃশ্যে প্রায়ই দেখা যায়, এমন কোনো হিমশীতল বস্তু উন্মুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গেই মুহূর্তে তীব্র শীতলতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে, ঘরের জানালার কাচ ফেটে যায় এবং চোখের পলকে চারপাশের আসবাবপত্র জমে নিরেট বরফে পরিণত হয়। তবে বাস্তবের পদার্থবিজ্ঞান ও তাপগতিবিদ্যার কঠোর সূত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সত্যকে সামনে নিয়ে আসে, যেখানে অতিশীতল বস্তুটি পরিবেশকে জমিয়ে বরফ বানায় না, বরং চারপাশের বাতাস ও দেয়াল থেকে দ্রুত তাপ শোষণ করে নিজেই ধীরে ধীরে উষ্ণ হতে শুরু করে।

কোনো বস্তুর তাপমাত্রা আসলে কী নির্দেশ করে, তা গভীরভাবে বোঝা প্রয়োজন। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঠান্ডা বা শীতলতা কোনো স্বতন্ত্র সত্ত্বা বা দৃশ্যমান পদার্থ নয়, যা কোনো বস্তুর ভেতরে সঞ্চিত হয়ে থাকে। বরং তাপমাত্রা হলো কোনো পদার্থের অভ্যন্তরে থাকা অণু ও পরমাণুগুলোর বিশৃঙ্খল তাপীয় গতির একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপক। শীতের দিনে দুই হাতের তালু পরস্পরের সঙ্গে সজোরে ঘষলে যে উষ্ণতা অনুভূত হয়, তা মূলত হাতের পেশির যান্ত্রিক শক্তিকে ঘর্ষণের মাধ্যমে ত্বকের অভ্যন্তরীণ অণু-পরমাণুর এলোমেলো গতিশক্তিতে রূপান্তরের ফল। তাপগতিবিদ্যার মৌলিক নীতি অনুযায়ী, কোনো পদার্থের তাপমাত্রা যত বৃদ্ধি পায়, তার কণাগুলোর ছুটোছুটি ও কম্পন তত দ্রুততর হয়। বিপরীতভাবে, কোনো বস্তুকে যখন ক্রমাগত শীতল করা হতে থাকে, তখন তার ভেতরের অণুগুলোর তাপীয় স্পন্দন ক্রমশ স্তিমিত হয়ে পড়ে। শূন্য কেলভিন তাপমাত্রায় পদার্থের অভ্যন্তরীণ তাপীয় শক্তি সর্বনিম্ন তাত্ত্বিক সীমায় নেমে আসে, যদিও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম অনুযায়ী কণার একটি ন্যূনতম শূন্য-বিন্দু শক্তি বা জিরো-পয়েন্ট এনার্জি অবশিষ্ট থেকে যায়। সাধারণ প্রাকৃতিক পরিবেশে পরমশূন্য তাপমাত্রায় পৌঁছানো অসম্ভব হলেও আধুনিক বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে এর অবিশ্বাস্য কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) বিজ্ঞানীরা লেজার কুলিং প্রযুক্তির মাধ্যমে সোডিয়াম পরমাণুর মেঘকে ৫০০ ন্যানোকেলভিন পর্যন্ত শীতল করেছিলেন, আর জার্মানির ব্রেমেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ড্রপ টাওয়ারে প্রায় ৩৮ পিকোকেলভিন তাপমাত্রার এক ক্ষণস্থায়ী রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন।

ঘরের টেবিলে রাখা ৪ কেলভিন তাপমাত্রার তামার টুকরোটির ক্ষেত্রে তাপ সঞ্চালনের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের নির্ভুল নির্দেশনায়। এই সূত্র অনুযায়ী, স্বাভাবিক পরিবেশে তাপ সর্বদা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চ তাপমাত্রার অঞ্চল থেকে নিম্ন তাপমাত্রার অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়। ঘরের বাতাসের স্বাভাবিক তাপমাত্রা যদি ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তবে তামার ধাতব পৃষ্ঠ এবং ঘরের ভেতরের পরিবেশের মধ্যে তাপমাত্রার ব্যবধান দাঁড়ায় প্রায় ২৯৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই বিশাল তারতম্যের কারণে টেবিলের সংস্পর্শে থাকা অংশের মাধ্যমে পরিবহন পদ্ধতিতে, চারপাশের বাতাসের মাধ্যমে পরিচলন পদ্ধতিতে এবং ঘরের দেয়াল, ছাদ ও আসবাবপত্র থেকে অবলোহিত বা ইনফ্রারেড বিকিরণ পদ্ধতিতে তামার দিকে তাপের প্রবল প্রবাহ শুরু হয়। তামার সংস্পর্শে আসা বাতাস দ্রুত ঠান্ডা হয়ে ঘন ও ভারী হয়ে নিচের দিকে নেমে যায় এবং সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে চারপাশ থেকে উষ্ণ বাতাস ছুটে আসে। ফলে তামার চারপাশের বাতাসে একটি অবিরাম চক্রাকার পরিচলন প্রবাহের সৃষ্টি হয়, যা অতিদ্রুত পরিবেশ থেকে তাপ টেনে নিয়ে তামার খণ্ডটিকে উষ্ণ করতে বাধ্য করে।

এই তীব্র তাপ স্থানান্তরের ফলে ঘরের বাতাসে দৃশ্যমান ও রাসায়নিক স্তরে বেশ কিছু চমকপ্রদ ও বিরল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আমাদের ঘরের স্বাভাবিক বাতাসে জলীয় বাষ্পের পাশাপাশি রয়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ নাইট্রোজেন ও ২১ শতাংশ অক্সিজেন গ্যাস। বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চাপে নাইট্রোজেন মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এবং অক্সিজেন মাইনাস ১৮৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে তরলে রূপান্তরিত হয়। তামার খণ্ডটির প্রাথমিক তাপমাত্রা মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় এটি তরল নাইট্রোজেন ও তরল অক্সিজেনের স্ফুটনাঙ্কের চেয়েও বহুগুণ বেশি শীতল। ফলে ঘরের বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প অতিদ্রুত তামার ধাতব গায়ে জমাট বেঁধে তুষারের মতো সাদা বরফের ঘন আস্তরণ তৈরি করে এবং চারপাশের বাতাস ঘনীভূত হয়ে সাদা ধোঁয়ার মতো জলকণার কুয়াশা ছড়িয়ে দেয়। এমনকি তামার গায়ে জমা হওয়া বাতাসের অতিশীতল অংশে সাময়িকভাবে অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন ঘনীভূত হয়ে হালকা নীলচে তরল অক্সিজেনের ফোঁটা অথবা কঠিন গ্যাসের সূক্ষ্ম স্তর সৃষ্টি হতে পারে, যা তামাটি গরম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়।

তবে প্রশ্ন ওঠে, এই অতিশীতল তামা কি একটি আস্ত ঘরের বাতাসকে বরফ বানিয়ে ফেলতে পারে? তাপ ধারণ ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট গাণিতিক হিসাব বলে, এর উত্তর স্পষ্টভাবে ‘না’। সাধারণ তাপমাত্রায় এক কেজি তামার তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি করতে প্রায় ৩৮৫ জুল তাপশক্তির প্রয়োজন হলেও ৪ কেলভিনের অতিশীতল অবস্থায় তামার আপেক্ষিক তাপ ধারণ ক্ষমতা চরম মাত্রায় হ্রাস পায়। ফলে শূন্য থেকে ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পৌঁছাতে এক কেজি ওজনের তামার টুকরোটি পরিবেশ থেকে সব মিলিয়ে মাত্র প্রায় ৭৮ কিলোজুল তাপ শোষণ করতে পারে। অন্যদিকে, একটি সাধারণ মাঝারি মাপের ঘরের আয়তন যদি ৬০ ঘনমিটার হয়, তবে তাতে বিদ্যমান প্রায় ৭০ কেজি বাতাসের তাপমাত্রা মাত্র এক ডিগ্রি সেলসিয়াস কমাতে প্রায় ৭০ কিলোজুল শক্তি প্রয়োজন। এর সাথে ঘরের দেয়াল, মেঝে, ছাদ এবং কাঠের তৈরি ভারী আসবাবপত্রের বিশাল তাপীয় বাফারিং ক্ষমতা যুক্ত থাকায় তামার খণ্ডটি পুরো ঘরের তাপমাত্রাকে গড়ে এক ডিগ্রির বেশি কমাতে পারে না। ঘরের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত রেখে তামার ধাতব খণ্ডটি নিজেই দ্রুত ঘরের তাপমাত্রার সাথে তাপীয় সাম্যাবস্থায় পৌঁছে যায়।

বিজ্ঞানীদের মতে, অতিশীতল ক্রায়োজেনিক প্রযুক্তির এই রহস্য কেবল সাধারণ কৌতূহল মেটানোর বিষয় নয়, বরং আধুনিক কোয়ান্টাম বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি। আজকের বিশ্বের সর্বাধুনিক সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কয়েক মিলিকেলভিন তাপমাত্রায় পরিচালনা করতে হয়, যা গভীর মহাকাশের গড় পটভূমি তাপমাত্রা ২.৭ কেলভিনের চেয়েও কয়েকগুণ বেশি শীতল। তাপীয় বিশৃঙ্খলা ও ইলেকট্রনিক নয়েজ থেকে কোয়ান্টাম কিউবিটগুলোকে সুরক্ষিত রাখতেই এই অতিশীতল পরিবেশ তৈরি করা হয়। তবে পরীক্ষাগারে ক্রায়োজেনিক পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের কঠোর সতর্কতা বজায় রাখতে হয়, কারণ মাইনাস ২৬৯ ডিগ্রি তাপমাত্রার কোনো বস্তুকে খালি হাতে স্পর্শ করলে ত্বকের ভেতরের কোষগুলো মুহূর্তের মধ্যে বরফে জমাট বেঁধে ছিঁড়ে গিয়ে মারাত্মক ফ্রস্টবাইট ও স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। পদার্থবিজ্ঞানের এই গভীর সত্য আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি সর্বদা শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখে এবং চরমতম শীতলতাও তাপের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের কাছে দ্রুত নিজের অস্তিত্ব সমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

সূত্র: Prothom Alo - বিজ্ঞানচিন্তা

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV