সংবাদ

কৈশোরে আমি এবং সে

কৈশোরে আমি এবং সে 24TV.Live — বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিউজ, টিভি ও স্পোর্টস পোর্টাল24TV.Liveসংবাদ · লাইভ টিভি · স্পোর্টস

এসএসসি পরীক্ষার পর অপূর্ব নিজ বাড়িতে অলস সময় পার করছিল। সংসারের একমাত্র ছেলে। মা–বাবার অনেক আদরের। ছোট দুই বোন আছে, বয়সের ব্যবধান ১০–১২ বছর। বাবা হাইস্কুলশিক্ষক, অল্প বেতনের চাকরি, মা পরিবারের প্রধান; কারণ, সীমিত আয়ের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার মা-ই করতে পারেন। বাবা রশিদ সাহেব ছোট চাকরি করলেও সংসারে ততটা অভাব অভিযোগ নেই। রশিদ সাহেবের বাপ–দাদা প্রায় জমিদারের কাছাকাছি ছিলেন, জমিজমা ভালোই ছিল। বিভিন্ন উপলক্ষে জমি বিক্রির প্রয়োজন পড়ে, তারপরও যা আছে, তা দিয়ে সংসার ভালোই চলে যাচ্ছে।

রশিদ সাহেব চাকরি থেকে ঘরে ফিরে আসেন, কিন্তু অতটা বিশ্রামের প্রয়োজন বোধ করেন না। সামান্য নাশতা–পানি খেয়ে গেঞ্জি গায়ে বেরিয়ে পড়েন সবজিখেত পরিচর্যা করতে। কী নেই তাদের বাড়ির উর্বর জমিতে, কাঁচা মরিচ, শিম, টমেটো কোনো কিছুই কিনতে হয় না। বাড়িটিও অনেক বড়, বিশাল আকারের দুটি বড় পুকুর, মাছের পরিপূর্ণ জোগান আসে বাড়ির পুকুর থেকেই। মোটাদাগে শাকসবজি, তরিতরকারি পুরোটাই আবাদ হয়, ফলফলাদিরও কোনো অভাব হয় না। এত সব কাজ করে ও রশিদ সাহেব ক্লান্ত হন না, শরীর মাশা আল্লাহ ভালোই থাকে।

অপূর্ব দু–তিন মাস পর যখনই ঢাকা থেকে বাড়ি আসে, অবাক হয় বাবার অক্লান্ত পরিশ্রম দেখে। বাবার মতো সে একদমই হয়নি, সে কিছুটা অলস প্রকৃতির, তবে মায়ের অনেক গুণ তার মধ্যে আছে। সে অতিশয় ভদ্র, ধৈর্যশীল।

একদিন সবজিখেতের আইলে বসে অপূর্ব দেখছিল কীভাবে তার বাবা এবং পাশের বাড়ির দেবাশীষ দাদা আগাছা পরিষ্কার করছিলেন। বলে রাখা ভালো, এই দেবাশীষ দাদা হচ্ছেন রশিদ সাহেবের ডান হাত। সব প্রয়োজনে দেবাশীষ দাদার ডাক পড়ে। মনেপ্রাণে একজন মাটির মানুষ দেবাশীষ দাদা, ভিন্ন ধর্মের হলেও এই পরিবারের সাথে তাঁর আত্মার সম্পর্ক। ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো জমিজমা নেই দেবাশীষ দাদার। মূলত রশিদ সাহেবদের খেতখামার বর্গা করে দেবাশীষ দাদার আয়রোজগার যা হয়, তাতেই উনার সংসার চলে। তামাটে রঙের পোড়ানো শরীর দেখলেই বাংলাদেশের আপামর কৃষকের কথা মনে পড়ে যায়। শক্ত শরীর, অত্যন্ত পরিশ্রমী এই মানুষেরাই দেশের উৎপাদিত বেশির ভাগ খাবারের জোগানদাতা। দেবাশীষ দাদাকে জামাকাপড় পরা অবস্থায় খুব কমই দেখা যায়। একখানা লুঙ্গি সাথে খালি শরীর নিত্যদিনের চিত্র। সারা দিন রোদে পুড়ে বেলা শেষে বাড়ি ফেরা। রাতে কখনো কখনো টিনের চালের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানিতে শরীর ভিজে যায়। দরিদ্র কৃষকের অসহায় বাস্তবতা।

দেবাশীষ দাদা কাজের পাশাপাশি অপূর্বর সাথে টুকটাক কথা বলছিলেন। হঠাৎ করে একটি মেয়ে দৌড়ে আসছিল, অপূর্ব যেখানে বসে ছিল, ঠিক তার পাশ দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। পিছে আরও একজন দৌড়ে আসছিল, এবার অপূর্ব বুঝতে পারল যে আগে দৌড়ে গেল, সে এ বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। পেছনে যাওয়া মেয়েটি ছিল অপূর্বর চাচাতো বোন। এবার অনুমান করা গেছে মেয়েটি কে ছিল? ছোটবেলায় দু–একবার হয়তো দেখেছে তাকে কিন্তু চেহারা অতটা মনে ছিল না। মেয়েটির নাম জানা ছিল, পরিচয় অতটা ছিল না। শাহনাজ এত বড় হয়ে গেছে, ভাবতেই অবাক লাগছে। শাহনাজ যেভাবে দৌড়ে গেল এবং সে উচ্চ স্বরে হাসছিল। তার এলোমেলো দৌড় আর হাসি অপূর্বর মনে এমন এক ধাক্কা দিল, যেন বারবার একই দৃশ্য চোখে ভাসতে লাগল। অদ্ভূত এক অনুভূতি, মনের মাঝেও কেমন একটা দাগ কেটে গেল। সন্ধ্যা নামল, সবাই ঘরে ফিরল; কিন্তু বিকেলের সেই দৃশ্য, শাহনাজকে দেখে যে ঝড় শুরু হয়েছে, অপূর্বর মনে তা থামছে না।

মনে হচ্ছে হঠাৎ সবকিছু অস্থির হয়ে গেছে, প্রাণের স্পন্দন বেড়ে গেছে। আশপাশের সবকিছুই ভালো লাগছে, অনেক ভেবেচিন্তে অপূর্ব বুঝতে পারল সে শাহনাজের প্রেমে পড়েছে। প্রথম প্রেম বোধ হয় এভাবেই জেগে ওঠে, আগেপিছে কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। মেয়েটি এখনো কিছুই জানে না আর ছেলেটি মনে মনে বহুদূর যেতে থাকল। কল্পনায় বাধা দেওয়ার কেউ নেই, যত দূর ইচ্ছা মনের বাসনা পূরণ করা সম্ভব।

এক রাত এক দিন অপূর্ব শুধু শাহনাজকে নিয়েই ভাবতে লাগল। বাবা, মা, আত্মীয়স্বজন, সামাজিক অবস্থান—কোনো কিছুই বাধা মনে হলো না, পৃথিবী যেন আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়ে গেছে, প্রকৃতি যেন নতুন রূপে সেজেছে, অপূর্বর কাছে জীবনটা বেশ রোমাঞ্চকর লাগছে। কোন কলেজে ভর্তি হবে, ঢাকায় কোথায় থেকে পড়বে—এসব একদমই মাথায় আসছে না এখন।

দুদিন পর চাচাতো বোনকে বাড়ির দক্ষিণ পাশে একা বসা অবস্থায় দেখে অপূর্ব এগিয়ে গেল, এ জায়গাটা বিকেলে বসার জন্য খুবই সুখকর। অপূর্ব গ্রামের বাড়িতে এখানটায় বিকেলটা কাটায়, দখিনা হাওয়া গায়ে পরশ বুলিয়ে যায়। শাহনাজদের বাড়ি এখান থেকে বরাবর তিন মিনিট হাঁটার রাস্তা। শাহনাজ ঘর থেকে বের হলে অপূর্বদের সীমানা থেকেই দেখা যায়। চাচাতো বোন মিলি বয়সে অপূর্বর চার–পাঁচ বছরের বড়। ইতস্তত করতে করতে অপূর্ব মিলিকে শাহনাজ সম্পর্কে প্রশ্ন করা শুরু করল, মিলি এখন কোথায় পড়ে? পরিবারের অন্য সদস্যরা কেমন আছে, কী করে, অপূর্বর লজ্জা লজ্জা ভাব মুখখানা দেখে মিলি কিছুটা কৌতূহল অনুভব করল।

মিলি এমন করে হাসল যেন ও বুঝতে পারছে অপূর্বর মনের অবস্থা। কিছু সময় পর অপূর্ব বলেই ফেলল, শাহনাজকে দেখে তার মনের অবস্থা খারাপ, বন্ধুত্ব করতে চায়, মিলিকে অনুরোধ করল ছোট একটা চিঠি মিলি কি শাহনাজের কাছে পৌঁছে দেবে? মিলি একটু ভাবল, তারপর বলল, ঠিক আছে দেবে।

জীবনের প্রথম প্রেমপত্রে অপূর্ব লিখল:

চিঠিটা মিলির হাতে দিয়ে অপূর্ব কিছুটা নির্ভার হলো, মনের পুরো আবেগ চিঠিতে প্রকাশ পেল না। মিলি সবকিছু বুঝে গেল, চিঠিটা না পড়েই হাতে গুঁজে নিল। চিঠি শাহনাজের কাছে পৌঁছাল; কিন্তু কোনো উত্তর এল না। অপূর্ব জানতে চাইলে মিলি বলল, শাহনাজ এসব বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক করতে চায় না, ওর বড় ভাইয়েরা জানলে সমস্যা হবে। মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো, দিনের সমস্ত আলো নিভে গেছে, চারদিকে শুধু অন্ধকার। প্রচণ্ড মন খারাপ হলো, মিলির সাথে বেশি কথা না বলে ঘরে ফিরে গেল। ঘরে ঢুকতেই মায়ের চোখে অপূর্বর মলিন মুখটা চোখ পড়ল, মা জানতে

অপূর্ব আর কথা না বাড়িয়ে শোবার ঘরে চলে গেল। শাহনাজ যা বলেছে, তাতে অপূর্বর রাগ হলেও সে আশা ছাড়েনি, পরদিন আবার সেই দখিনা বাতাসের আশায় বাড়ির শেষ প্রান্তে বসা। যদি শাহনাজকে একটু দেখা যায়। সেদিন শাহনাজকে দেখা গেল না ঘরের বাইরে। দিনে এখন দু–তিনবার ও দক্ষিণ সীমান্তে যাওয়া হয় অপূর্বর মনের অজান্তেই প্রচণ্ড সেই শিহরণ বারবার শাহনাজকে মনে করিয়ে দেয়, সেই দৌড়াতে দৌড়াতে চলে যাওয়া, উচ্চ স্বরে কোকিলকণ্ঠী হাসির আওয়াজ, অপূর্বর ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ঠিক তৃতীয় দিন শাহনাজকে তার সীমান্তে গাছতলায় বসে থাকতে দেখা গেল, অপূর্বকে অবাক করে সে হাতে ইশারা করল তাদের সীমানায় যেতে। শুরুতে একটু দ্বিধা থাকলেও অনবরত হাতের ইশারায় কাছে ডাকা, মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। অপূর্ব চারদিকে একটু দেখে নিল, কেউ তাকে ফলো করছে কিনা। গ্রামে এটা খুব সুখকর নয় যে দুজন কিশোর–কিশোরী পাড়া–প্রতিবেশীর সামনে দেখাসাক্ষাৎ করছে। সমস্যাটা দুজনের জন্যই সমান মনে হচ্ছে অপূর্বর কাছে।

অপূর্বর আর তর সইছে না, আশপাশে কে কী ভাবল, তার চেয়ে বড় এই বয়সের আবেগ, সে ছুটল শাহনাজের ডাকে।

শাহনাজ: তোমার চিঠি আমার ভালো লেগেছে।

অপূর্ব: তবে যে মিলিকে বললে তুমি চাও না।

সূত্র: Prothom Alo - Latest

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

বেটা ঘোষণা: এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।
মতামত দিন