রেডিও তরঙ্গ থেকে ডিজিটাল যুগ: বিবিসি বাংলার ৮৫ বছরের গৌরবময় পথচলা
১৯৪১ সালের ১১ অক্টোবর, চারদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘনঘটা। সেই উত্তাল সময়ে রণক্ষেত্রের নির্ভরযোগ্য তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিবিসি চালু করেছিল বাংলা বিভাগের সম্প্রচার। মাত্র ১৫ মিনিটের একটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান দিয়ে লন্ডনের বুশ হাউসে শুরু হওয়া সেই ছোট্ট উদ্যোগটি আজ কোটি কোটি বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গে পরিণত হয়েছে।
জর্জ অরওয়েল থেকে শুরু ও বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের সাক্ষী
খুব কম মানুষই জানেন, বিবিসি বাংলার শুরুর দিনগুলোতে লন্ডনের ইন্ডিয়া সেকশনে বসে অনুষ্ঠান তদারকি ও ইংরেজি স্ক্রিপ্ট লিখতেন বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক এরিক ব্লেয়ার—যাঁকে বিশ্ব চেনে কালজয়ী ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল হিসেবে। কালের বিবর্তনে ১৯৪৭-এর দেশভাগ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিবিসি বাংলা হয়ে উঠেছিল মুক্তিকামী বাঙালির সবচেয়ে বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল।
একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও রূপপুরের ‘বিবিসি বাজার’
একাত্তরে যখন পাকিস্তানি সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও কঠোর সেন্সরশিপে গোটা দেশ অবরুদ্ধ, তখন অন্ধকার রাতে ঘরের কোণে শর্টওয়েভ রেডিওর নব ঘুরিয়ে বিবিসির খবরের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন দেশবাসী। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে প্রতিদিন সন্ধ্যায় রেডিওর সামনে মানুষের বাঁধভাঙা ভিড় থেকেই তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত ‘বিবিসি বাজার’—যা ইতিহাসের পাতায় গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের নিখাদ ভালোবাসার অনন্য প্রতীক।
“বিবিসিতে আমরা বিশ্বাস করি—‘বিশ্বাস কোনো উপহার নয়, তা অর্জন করে নিতে হয়’ (Trust is earned)। প্রযুক্তির বিবর্তনে প্ল্যাটফর্ম বদলেছে ঠিকই, কিন্তু সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার ৮৫ বছর আগের মতোই অবিচল রয়েছে।” — বিবিসি বাংলা সম্পাদকীয় নীতি
রেডিওর বিদায় ও স্মার্টফোনে আধুনিক ডিজিটাল বিপ্লব
টানা ৮১ বছর তরঙ্গের মায়াবী সুরে আকাশজুড়ে ভেসে বেড়ানোর পর ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেমে যায় বিবিসি বাংলার ঐতিহাসিক রেডিও সম্প্রচার। তবে থেমে থাকেনি সাংবাদিকতা। সময়ের প্রয়োজনে রেডিওর গণ্ডি পেরিয়ে ওয়েবসাইট, ইউটিউব, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এক অত্যাধুনিক মাল্টিমিডিয়া নিউজরুম। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যখন দেশে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ছিল, তখনও প্রবাস ও বিশ্বজুড়ে কোটি বাংলাভাষীর কাছে নির্ভরযোগ্য খবরের প্রধান ভরসা ছিল এই বিবিসি বাংলা।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।