৬১০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি সশস্ত্র তিন সংগঠনের

আমার দেশ গ্রাফিক্সপার্বত্য তিন জেলায় স্থানীয় তিন সংগঠন বছরে ৬১০ কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করে। পার্বত্য অঞ্চলের ৪১টি খাত থেকে তারা এই চাঁদা তোলে। এ টাকায় তারা গড়ে তুলেছে বিশাল অস্ত্রের মজুত। সম্প্রতি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
আমার দেশ গ্রাফিক্সপার্বত্য তিন জেলায় স্থানীয় তিন সংগঠন বছরে ৬১০ কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করে। পার্বত্য অঞ্চলের ৪১টি খাত থেকে তারা এই চাঁদা তোলে। এ টাকায় তারা গড়ে তুলেছে বিশাল অস্ত্রের মজুত।
সম্প্রতি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এতে বলা হয়, পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিদের সবচেয়ে বড় বোঝা হলো আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ধার্য করা বার্ষিক চাঁদা। প্রশাসনের নজরদারির বাইরে এসব চাঁদা বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হয়।
জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু) ২৮০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-প্রসীত) ২৫০ কোটি টাকা ও কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) ৭৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকা চাঁদা তোলে। স্থানীয়রা জানান, পাহাড়ে উৎপাদিত কলা, আদা, হলুদ, আনারস, আম, জুমের ফসলসহ যে কোনো উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি করতে চাইলে প্রতিটি ধাপে সশস্ত্র আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোকে চাঁদা দিতে হয়। এমনকি বাঙালিদের বাড়ি-ঘর নির্মাণ, গবাদিপশু বেচাকেনা বা নতুন ব্যবসা শুরু করতেও চাঁদা দিতে হয়।
চাঁদা দিতে হয় সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদেরও। অনেকে একে ‘জবরদস্তি ট্যাক্স’ বলে আখ্যায়িত করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদা আদায়ের খাতগুলোকে ছয়টি প্রধান সেক্টরে ভাগ করা হয়েছে।
সেখানে মোট ৪১টি উপখাতের নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সাধারণ খাতগুলো হচ্ছে চাকরিজীবী (বেসরকারি), পরিবার (বেসরকারি), গরু-ছাগলসহ গবাদিপশু বিক্রি, হাঁস-মুরগি বিক্রি, ভারতীয় গরু-মহিষ বিক্রি ও পাহাড়ি পরিবার। আঞ্চলিক দলগুলো ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১১টি খাতে চাঁদা নেয়।
সেগুলো হচ্ছে দোকান (বড়, মাঝারি ও ছোট), মোবাইল ফোন কোম্পানি, মোবাইল টাওয়ার, ছোট-বড় ইটভাটা, মিল-কারখানা, মাছ ব্যবসায়ী সমিতি, আবাসিক হোটেল, আসবাবপত্র বা ফার্নিচার দোকান, কুরিয়ার কোম্পানি, ছোট-বড় খাবার হোটেল ও ভাসমান আবাসিক হোটেল। তারা কৃষি, ফলদ ও বনজ বাগান থেকে ১১টি খাতে চাঁদা নেয়। এগুলো হচ্ছে বাগানপ্রতি বার্ষিক চাঁদা, হলুদ ও আদার বস্তাপ্রতি, কলার ছড়াপ্রতি, ফলপ্রতি, বাগান মালিক, তামাক চাষি, তামাক চুল্লি, তামাক কোম্পানি, মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী ফুল বা উলু ফুল দিয়ে তৈরি ঝাড়ুপ্রতি, জুমচাষি প্রতি চাঁদা নেয়।
যানবাহনের আটটি খাত থেকে তারা চাঁদা নেয়। এগুলো হচ্ছে ট্রাক ও পিকআপ, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল, লঞ্চ ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা, স্পিডবোট, বাস, বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ি ও চাঁদের গাড়ি। প্রত্যেক ঠিকাদারকে কাজের অনুপাতে চাঁদা দিতে হয়।
বাঁশ ও কাঠ ব্যবসায়ীদের কাঠের সিএফটি ও পিস হিসেবে এবং কাঠের জোত মালিককে চাঁদা দিতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো গত এক বছরে ১০৩ জনকে অপহরণ করেছে। তারা সাধারণ নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের অপহরণ করে ওই অঞ্চলের উন্নয়ন ও শান্তির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই অপহরণ সংস্কৃতি কেবল ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য বিভীষিকা নয় বরং এটি পুরো পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর একটি হাতিয়ার। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখা, মুক্তিপণের মাধ্যমে বিপুল অর্থ সংগ্রহ এবং মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারের জন্য অপহরণকে একটি কৌশল হিসেবে নিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অবৈধ অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বড় অংকের চাঁদাবাজি করে।
এই টাকা দিয়ে তারা অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনে। সম্প্রতি জেএসএস সন্তুর একটি সশস্ত্র দল ১৯টি অস্ত্র, ২,৫৮০ রাউন্ড গোলাবারুদ ও ২০টি হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করেছে। এছাড়া ইউপিডিএফ (প্রসীত) ৬০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮৮৫০ রাউন্ড অ্যামুনিশন ও ১০টি হ্যান্ড গ্রেনেড সংগ্রহ করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সশস্ত্র দলগুলো বিশেষত ভারত ও মিয়ানমার থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ এবং মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে। সশস্ত্র সংগঠনগুলো মাদকদ্রব্য বিক্রির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ সংগ্রহ করে। ইউপিডিএফ, জেএসএস ও কেএনএফসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর কাছে কী ধরনের অস্ত্র আছে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসীদের হাতে একে-৪৭, একে-৫৬, একে-২২, এম-১৬, মার্ক-২ রাইফেল, এম-৪ কার্বাইন, ৪০ এমএম গ্রেনেড লঞ্চার, চায়না রাইফেল, নাইন এমএম পিস্তল, এসএলআর, এসএমজি, এলজি, বিমানবিধ্বংসী রিমোট কন্ট্রোল বোমা, গ্রেনেড, হেভি মেশিনগান, জি-৩ রাইফেল, স্নাইপার রাইফেলের মতো ভয়ানক অস্ত্র রয়েছে।
এ ছাড়াও তাদের কাছে রয়েছে রকেট লঞ্চার, বিভিন্ন ধরনের হাতবোমা, শক্তিশালী ওয়াকিটকি ও মর্টার। আছে ড্রোন, সিগন্যাল জ্যামারসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন সরঞ্জামও। তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে থাকা পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযানে এ ধরনের অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
পার্বত্য সংগঠনগুলোর চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙামাটি জেলা পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব আমার দেশকে বলেন, চাঁদাবাজির বিষয়ে আমরা যখনই কোনো অভিযোগ পাই সেটা মামলা হিসেবে রেকর্ড করি। যারা চাঁদাবাজি করে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাই। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অবস্থান থাকে দুর্গম এলাকায়।
এক্ষেত্রে আমরা সেনাবাহিনী ও বিজিবির সহযোগিতা নিয়ে থাকি। অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আমরা কাজ করছি। জননিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশ টহল ও তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
কমিশন গঠন করে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রোকন উদ্দিন এসব বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধ করতে হলে ভূমি সমস্যা সমাধানসহ বেশ কয়েকটি বিষয়ে কাজ করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে বহু সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন।
সেখানে সেবাবাহিনীর উপস্থিতি থাকায় পার্বত্য চট্টগ্রামে আর্থসামাজিক, শিক্ষা ও অবকাঠামোগত নানাবিধ উন্নয়ন হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন সরকারি চাকরিতে কোটাসহ ব্যাপক সুবিধা পাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঁদাবাজ ও অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের সহযোগিতা করে ভারত।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে যারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তাদের কিছু লোককে টার্গেট করে দেশের বিরুদ্ধে অস্থিরতা তৈরিতে কাজে লাগাচ্ছে প্রতিবেশী দেশটি। তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৯৭ সালে তড়িঘড়ি করে একটি কথিত শান্তি চুক্তি করা হয়েছে। সেই অসম চুক্তির পর আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলো লোক দেখানোভাবে কিছু পুরোনো ও অকেজো অস্ত্র জমা দিয়েছে।
কিন্তু তাদের কাছে বিশাল অস্ত্রের মজুত রয়ে গেছে। তারা এসব অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, অবৈধ দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সহযোগিতা করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরো বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি পরবর্তী সময়ে দুই শতাধিক সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার ও প্রশাসনিক শূন্যতা নতুন কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ওই পার্বত্য শান্তিচুক্তিটি বিভিন্ন কারণে বিতর্কিত হয় এবং কিছু ধারা সংবিধানবিরোধী হওয়ার কারণে পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে সেটি জরুরি ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন করা আবশ্যক।
রোকন উদ্দিন আরো বলেন, ২০২১ সালে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলো কার্যত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ওই সময় থেকে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি ‘অস্ত্রের উন্মুক্ত বাজার’। যেখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠী সহজেই অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অঞ্চলে একে সিরিজের রাইফেল, রকেট লঞ্চার ও আধুনিক গোলাবারুদের অবাধ প্রবাহ রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তাবিষয়ক এই বিশ্লেষক বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় শান্তিশৃঙ্খলা ফেরাতে শান্তিচুক্তির পুনর্মূল্যায়ন ও সব অংশীজনকে নিয়ে একটি কমিশন গঠন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।




মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।