কেশম দ্বীপে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি ইরানের: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা

ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে যে, তারা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কেশম দ্বীপের আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিত করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর জনসংযোগ দপ্তরের একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি উদ্ধৃত করে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, ইরানের সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ড্রোনটিকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয় এবং আকাশেই এটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উত্তেজনার এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
ইরানি সেনাবাহিনীর জনসংযোগ দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে ড্রোনটিকে ‘আগ্রাসী মার্কিন শত্রুর’ একটি অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসী বাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর যেকোনো ধরনের আঘাতের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, ড্রোনটি তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছিল, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। যদিও এই চাঞ্চল্যকর দাবি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সাধারণত এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর বা পেন্টাগন প্রাথমিক তদন্ত শেষ না করা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে। তবে এই ড্রোন ভূপাতিত করার খবরটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ভৌগোলিকভাবে কেশম দ্বীপ ইরানের বৃহত্তম দ্বীপ এবং এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির উত্তর প্রবেশপথের কাছে অবস্থিত। উল্লেখ্য যে, এই প্রণালিটি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা উত্তেজনার প্রভাব সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের ওপর পড়ে। ইরান এর আগেও কেশম দ্বীপ এবং এর আশপাশের জলসীমার আকাশে মার্কিন ড্রোন প্রতিহত করার একাধিক দাবি করেছিল। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের সামরিক উত্তেজনার দীর্ঘ ইতিহাসে ড্রোন ভূপাতিত করার ঘটনা নতুন কিছু নয়, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে যখন পারস্য উপসাগরে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ রয়েছে, তখন এ ধরনের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। যদিও গত জুন মাসে একটি সমন্বিত শান্তিচুক্তির বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান হয়নি। শান্তিচুক্তির প্রক্রিয়া চলমান থাকা সত্ত্বেও কেন এই ধরনের ড্রোন অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে, তারা তাদের আকাশসীমা রক্ষায় কোনো ধরনের আপস করবে না এবং যেকোনো বিদেশি আগ্রাসন কঠোর হাতে দমন করা হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই দাবি করে থাকে যে তাদের ড্রোনগুলো আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় নিয়মিত নজরদারি চালায় এবং কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে না।
এই ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনী এবং ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেল বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমকিউ-৯ ড্রোনটি মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নিখুঁত হামলার জন্য পরিচিত, যা মার্কিন বিমান বাহিনীর অন্যতম প্রধান অস্ত্র। এটি ভূপাতিত করার মাধ্যমে ইরান তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতার এক ধরনের প্রদর্শনী করল বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে এবং উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানাচ্ছে। তবে কেশম দ্বীপের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আস্থার সংকট এখনো কাটেনি এবং যেকোনো ছোটখাটো ঘটনাও বড় ধরনের যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে পারে।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।