দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর দুই পারে ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এসব উদ্ভিদ বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। ইতিমধ্যে হালদার তীরে ২৩ প্রজাতির বিপন্ন উদ্ভিদের উপস্থিতি পাওয়া...
দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর দুই পারে ১০০ প্রজাতির উদ্ভিদ বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এসব উদ্ভিদ বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা। ইতিমধ্যে হালদার তীরে ২৩ প্রজাতির বিপন্ন উদ্ভিদের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
নদীতীরে কৃষিকাজের বিস্তার, দূষণ ও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে প্রাকৃতিক উদ্ভিদের আবাসস্থলও সংকুচিত হচ্ছে। সম্প্রতি হালদা নদীর দুই পারে পরিচালিত এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় মোট ১ হাজার ২৯ প্রজাতির উদ্ভিদের উপস্থিতির কথা জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে ৭২৯ প্রজাতির উদ্ভিদ প্রথমবারের মতো নথিভুক্ত করেছেন গবেষকেরা। এমন কিছু দুর্লভ উদ্ভিদও পাওয়া গেছে, যেগুলোর উপস্থিতি আগে চট্টগ্রাম জেলায় নথিভুক্ত ছিল না। .বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান অপিনিয়ন (ইকো) ও বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের (বিএসআরএম) সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আজ মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজারের একটি রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করে গবেষণার ফলাফল জানায় ইকো। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গবেষণাটি পরিচালিত হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ওমর ফারুকের নেতৃত্বে গবেষকদল হালদার উৎপত্তিস্থল থেকে মোহরা পর্যন্ত প্রায় ৮১ কিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালায়।
মোহাম্মদ ওমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, গবেষণাটি এখনো কোনো বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়নি। পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়েছে। শিগগিরই জমা দেওয়া হবে।
.বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে যেসব উদ্ভিদগবেষণায় ভবিষ্যতে বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা উদ্ভিদের মধ্যে নীলজুঁই, তেজবহুল, ফাইজ গাছ, সিধা জারুল, কুচি পাম, নাট অলকুশি, খনা, অশোক ও বরুণের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রথমবার নথিভুক্ত হওয়া উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে লেইসা গর্জন বা লেংড়া গর্জন এবং পাথা টেকিয়া। এসব উদ্ভিদের উপস্থিতি আগে চট্টগ্রাম জেলায় নথিভুক্ত ছিল না বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
.গবেষণায় ৫১ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদও পাওয়া গেছে। তবে নদীতীরের সব এলাকায় প্রাকৃতিক উদ্ভিদের উপস্থিতি সমান নয়। বিশেষ করে নাজিরহাট সেতু থেকে নারায়ণহাটের আগপর্যন্ত প্রাকৃতিক উদ্ভিদ তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ধারণা, নদীর দুই পারে কৃষিকাজ ও ফসল চাষের বিস্তারে এসব উদ্ভিদের আবাসস্থল সীমিত হয়ে পড়ছে। .দূষণের ২৯ উৎস শনাক্তউদ্ভিদবৈচিত্র্যের পাশাপাশি হালদার দূষণের চিত্রও উঠে এসেছে গবেষণায়। নদীদূষণের জন্য দায়ী ২৯টি উৎস চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।
এর মধ্যে রয়েছে শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, কৃষিজমির রাসায়নিক সার ও কীটনাশক, বসতবাড়ির ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিক এবং নৌযান থেকে নির্গত তেল। কর্ণফুলী নদীর দূষিত পানির প্রভাবও হালদার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করা হয়েছে এ গবেষণায়। গবেষণায় নদীর উজানে লবণাক্ত পানির প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে।
সাধারণত উপকূলীয় লবণাক্ত পরিবেশে জন্মানো কেওড়াগাছের উপস্থিতি পাওয়া গেছে কর্ণফুলীর মোহনা থেকে হাটহাজারীর নাঙ্গলমোড়া পর্যন্ত। গবেষকদের মতে, এটি উজানে লবণাক্ত পানির প্রভাব বাড়ার ইঙ্গিত হতে পারে। হালদার উদ্ভিদবৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও দূষণ বন্ধে ১৩ দফা সুপারিশ করেছে ইকো।
এর মধ্যে রয়েছে বিপন্ন ও দুর্লভ উদ্ভিদ সংরক্ষণ, নদীতীরে দেশীয় গাছ রোপণ, শিল্পবর্জ্য পরিশোধন, নদী দখল বন্ধ এবং নিয়মিত জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ।
হালদাপারে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে ১০০ উদ্ভিদ—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহলে গভীর আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। প্রথম আলো ও অন্যান্য গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, এই ঘটনার সার্বিক গতিপ্রকৃতির ওপর নিয়মিত নজর রাখা হচ্ছে এবং পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত অনুযায়ী, রাজনীতি অঙ্গনে এই উন্নয়ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ভূমিকা পালন করবে। ইতিবাচক ফলাফল ধরে রাখতে নিয়মমাফিক পর্যবেক্ষণ ও সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!