প্রত্যক্ষদর্শী দুই সেনা কর্মকর্তার লেখায় ৭ নভেম্বরের বিপ্লব

পঁচাত্তরের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। দেশের জন্য এই সময়টা ছিল গভীর সংকটময়, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়া দেশ চলছিল, যা ছিল একটি চরম নেতৃত্বহীন ক্রান্তিকাল। এ পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব দেশকে অনিশ্চিত অবস্থা থেকে রক্ষা করে। স...
পঁচাত্তরের ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। দেশের জন্য এই সময়টা ছিল গভীর সংকটময়, সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ছাড়া দেশ চলছিল, যা ছিল একটি চরম নেতৃত্বহীন ক্রান্তিকাল। এ পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব দেশকে অনিশ্চিত অবস্থা থেকে রক্ষা করে।
সিপাহিদের ভাষায় এটি ছিল ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন’। ওই সময়টিতে ঢাকা সেনানিবাসে কর্মরত গুরুত্বপূর্ণ দুজন সেনা কর্মকর্তার লেখায় এ কথা উঠে এসেছে। তারা হলেন ঢাকা সেনানিবাসের তৎকালীন অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী ও তৎকালীন ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার লে. কর্নেল এমএ হামিদ পিএসসি।
সেনানিবাসের অভ্যন্তরের ঘটনাবলি তখন তারা খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাদের চোখের দেখা ঘটনার চমৎকার বিবরণ তারা তুলে ধরেছেন নিজেদের লেখা বইতে। তেমনি মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও গবেষক মেজর রফিকুল ইসলামও সে সময়ের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করেছেন তার বইয়ে।
মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী (বীরবিক্রম) তার ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক’ বইয়ে লেখেন ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব দেশকে একটি নিশ্চিত গৃহযুদ্ধ এবং বিদেশি আগ্রাসনের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। ৩ নভেম্বরের পর সাধারণ সৈনিকদের মনে ভয় ঢুকেছিল যে, দেশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সেই ভয় দূর করে সিপাহি ও জনগণের মধ্যে এক অভূতপূর্ব জাতীয় সংহতি তৈরি করে।
জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত সততা ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাই সে সময় সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল। মইনুল হোসেন চৌধুরী তার বইয়ে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন, ৭ নভেম্বর ভোরের মধ্যেই জাসদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধারণ জওয়ানদের জাতীয়তাবাদী আবেগের কাছে মার খায় এবং জিয়াউর রহমান সম্পূর্ণ পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হন। তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পুরো পরিস্থিতির হাল ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ৭ নভেম্বর ভোরের দিকে সেনানিবাসে এক ভয়ংকর অরাজক পরিস্থিতি ছিল, যেখানে সাধারণ সিপাহিরা অফিসারদের নির্দেশ মানতে চাচ্ছিল না। জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়েই প্রথমে রেডিওতে ভাষণ দিয়ে দেশবাসীকে শান্ত করেন। এরপর তিনি সেনানিবাসে চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর পদক্ষেপ নেন।
তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে কর্নেল তাহের ও জাসদের অবাস্তব দাবি-দাওয়া (যেমন অফিসারহীন সেনা কাঠামো) উড়িয়ে দেন এবং সেনাবাহিনীকে একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার বাহিনী হিসেবে পুনর্গঠন করতে মনোযোগ দেন। মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী আরো লেখেন, ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। যদি সেদিন জিয়াউর রহমানের মতো একজন সর্বজনগ্রাহ্য নেতা হাল না ধরতেন, তবে সেনাবাহিনী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেত এবং দেশ একটি দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ কিংবা বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের মুখে পড়ত।
৭ নভেম্বর সাময়িকভাবে সেনাবাহিনীতে এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করলেও, দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী সরকার গঠনের পথ তৈরি করেছিল। প্রায় সব অফিসারই স্বীকার করেছেন, সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জিয়ার জনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্নাতীত এবং ৭ নভেম্বরের মূল চালিকাশক্তি ছিল জিয়ার প্রতি সিপাহিদের ভালোবাসা ও আস্থা। সাধারণ সিপাহিদের কাছে এটি ছিল ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন’।
লে. কর্নেল এমএ হামিদ তৎকালীন ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডার ছিলেন। সেনানিবাসের ভেতরের পরিস্থিতি খুব কাছ থেকে দেখা এই কর্মকর্তা তার ‘তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা’ বইয়ে ৭ নভেম্বরের চমৎকার চোখের দেখা বিবরণ দিয়েছেন। তিনি ৭ নভেম্বরকে সিপাহি ও জনতার এক স্বতঃস্ফূর্ত এবং অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি লিখেছেন, ৭ নভেম্বর রাতে সাধারণ সৈনিকরা যখন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে ট্রাকে করে রাজপথে নেমে আসে, তখন তাদের চোখে-মুখে ছিল একধরনের মুক্তির আনন্দ। জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর টু-ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে যে অভূতপূর্ব উল্লাস তৈরি হয়েছিল, তার নিখুঁত চিত্র তিনি তুলে ধরেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সেনানিবাসে অফিসারদের ওপর সিপাহিদের ক্ষোভ এবং পরবর্তী দিনগুলোতে অফিসার হত্যার দুঃখজনক ঘটনাগুলোর কথাও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছেন।
এমএ হামিদ পরিষ্কারভাবে লিখেছেন, ৭ নভেম্বরের মূল চালিকাশক্তি ছিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রতি সিপাহিদের গভীর ভালোবাসা ও বিশ্বাস। ৩ নভেম্বর জিয়াকে যখন বন্দি করা হয়, তখন থেকেই সাধারণ জওয়ানদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। সিপাহিদের স্পষ্ট ধারণা ছিল , জিয়াউর রহমান ছাড়া দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনা অসম্ভব।
৭ নভেম্বর রাতে যখন সিপাহিরা বিদ্রোহ করে জিয়াকে মুক্ত করে ২ নম্বর ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টে নিয়ে আসে, তখনকার অভূতপূর্ব আনন্দের দৃশ্য তিনি বইয়ে তুলে ধরেন। তিনি লেখেন, সাধারণ সিপাহিরা তখন খুশিতে জিয়াকে কাঁধে তুলে নেন। কর্নেল হামিদ লেখেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনা কোনো সাধারণ বা পরিকল্পিত সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না।
এটি ছিল সিপাহি ও জনগণের এক বিশাল, স্বতঃস্ফূর্ত ও ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। তিনি আরো লিখেছেন, ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পার হওয়ার পর সেনানিবাস থেকে সিপাহিরা যখন ট্যাংকে এবং ট্রাকে করে ঢাকার রাজপথে বেরিয়ে আসে, তখন সাধারণ মানুষও তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ স্লোগানে পুরো ঢাকা শহর প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল।
এই দুই শক্তির মিলনকেই তিনি সত্যিকারের ‘বিপ্লব’ ও ‘সংহতি’ হিসেবে দেখেছেন, যা এর আগে বা পরে বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে একটি সমাজতান্ত্রিক ও অফিসারহীন সেনাবাহিনী গঠন করতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধারণ সিপাহিদের সিংহভাগই কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা সমাজতন্ত্রের জন্য রাস্তায় নামেনি।
তারা নেমেছিল শুধু তাদের প্রিয় নেতা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে। লে. কর্নেল হামিদ আরো উল্লেখ করেন, কর্নেল তাহের যখন জিয়াকে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইলেন, তখন সাধারণ সিপাহিদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে সেই চেষ্টা ভেস্তে যায়। এমএ হামিদ একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে ৭ নভেম্বরের একটি অন্ধকার ও বেদনাদায়ক দিকও, অর্থাৎ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা হত্যার কথাও বইয়ে তুলে ধরেছেন।
এমএ হামিদের মতে, ৭ নভেম্বর ভোরের দিকে সেনানিবাসের পরিস্থিতি এতটাই উত্তাল ও বিশৃঙ্খল ছিল যে, যেকোনো সময় পুরো দেশ একটি গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারত। এই চরম মুহূর্তে জিয়াউর রহমান যেভাবে অসীম ধৈর্য এবং দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন, যা ছিল খুবই প্রশংসনীয়। মুক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমান অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সিপাহিদের শান্ত করেন, ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন এবং ভেঙে পড়া চেইন অব কমান্ড জোড়া লাগিয়ে সেনাবাহিনীতে কঠোর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।
মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ও গবেষক মেজর রফিকুল ইসলাম তার ‘বাংলাদেশ : সামরিক শাসন ও গণতন্ত্রের সংকট’ গ্রন্থে এ সময়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ৭ নভেম্বরকে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক মেরূকরণের দিন হিসেবে দেখেছেন, যেখানে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। তিনি উল্লেখ করেন, সিপাহিরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করলেও কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন (শ্রেণিহীন সেনাবাহিনী গঠন)।
কিন্তু জিয়াউর রহমান মুক্ত হওয়ার পরপরই সিপাহিদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে জাসদ বা তাহেরের বিপ্লবী এজেন্ডার বাইরে গিয়ে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও দেশের সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠনে হাত দেন। লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক (বর্তমানে সরকারের প্রধান তথ্য অফিসার)। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।




মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।