গভীর সমুদ্রে বিশাল পাথর ফেলছে গ্রিনপিস: বটম ট্রলিং রুখতে পরিবেশবাদীদের অভিনব প্রতিবাদ

বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের তলদেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এক অভিনব ও সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে গভীর সমুদ্রের তলদেশে বিশাল আকৃতির ৯টি পাথর ফেলেছে সংগঠনটি। মূলত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতিতে মাছ ধরা বন্ধ করার লক্ষ্যেই এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। গ্রিনপিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমুদ্রের তলদেশে ভারী জাল ফেলে মাছ ধরার এই পদ্ধতিটি সামুদ্রিক উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। এই ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়া রুখতে এবং সমুদ্রের তলদেশকে সুরক্ষিত রাখতে তারা এই কঠোর পথ বেছে নিয়েছে। গ্রিনপিস দাবি করেছে যে, তাদের এই পদক্ষেপের ফলে সাউদার্ন নর্থ সি মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়ার প্রায় ১১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা এখন বটম ট্রলিংমুক্ত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বৈঠকের পরও কোনো কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় তারা শেষ উপায় হিসেবে কোনো অনুমতি ছাড়াই এই পাথরগুলো সমুদ্রে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়।
বটম ট্রলিং হলো এমন একটি মাছ ধরার পদ্ধতি যেখানে সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বিশাল ও ভারী জাল টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় জালের ভারে সমুদ্রের তলদেশের মাটি ও উদ্ভিদ ওলটপালট হয়ে যায়, যা সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের অপূরণীয় ক্ষতি করে। গ্রিনপিসের তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রের তলদেশ এভাবে সেচে মাছ সংগ্রহের কারণে নতুন ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র মাছের আবাসস্থল ধ্বংস করছে না, বরং অনেক সামুদ্রিক প্রাণীর খাদ্যসংকটও তৈরি করছে। বিশেষ করে ট্রলিংয়ের ফলে সৃষ্ট শব্দদূষণ ডলফিন বা হাঙরের মতো দেখতে পারপয়েস নামের অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাণীর শিকারের ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে। পারপয়েসরা সাধারণত শব্দের প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে তাদের শিকার খুঁজে বের করে, কিন্তু ট্রলিংয়ের প্রচণ্ড শব্দে তাদের এই প্রাকৃতিক ক্ষমতা ব্যাহত হয়, যা শেষ পর্যন্ত তাদের অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। গ্রিনপিস মনে করে, সমুদ্রের এই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে বটম ট্রলিংয়ের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন।
পরিবেশবাদীদের এই কর্মকাণ্ডের পর যুক্তরাজ্যের পরিবেশ, খাদ্য ও পল্লিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষায় যুক্তরাজ্যে অত্যন্ত কঠোর আইন বিদ্যমান রয়েছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সমুদ্রের যেকোনো কর্মকাণ্ড অবশ্যই বিদ্যমান আইন মেনে পরিচালিত হওয়া উচিত। বিশেষ করে সমুদ্র ব্যবহারকারী অন্যান্য জাহাজ এবং নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ইতিমধ্যে ১০০টিরও বেশি স্থানে ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করছে। গ্রিনপিস অবশ্য তাদের কাজের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পাথরগুলো ফেলার পরপরই সেগুলোর সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান বা কো-অর্ডিনেটস কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছে। এর ফলে মেরিন ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন তাদের মানচিত্র হালনাগাদ করতে পেরেছে এবং অন্যান্য জাহাজকে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কবার্তা প্রদান করেছে।
উল্লেখ্য যে, গ্রিনপিসের পক্ষ থেকে সমুদ্রে পাথর ফেলার এই ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২২ সালে তারা কর্নওয়াল উপকূলে ১৮টি বিশাল পাথর ফেলেছিল একই উদ্দেশ্যে। পরিবেশবাদীদের মতে, যখন আইনি প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি সমুদ্রের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন এ ধরনের সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। গ্রিনপিস মনে করে, সমুদ্রের তলদেশে এই বিশাল পাথরগুলো প্রাকৃতিক বাধা হিসেবে কাজ করবে, যার ফলে বড় ট্রলারগুলো সেখানে জাল ফেলতে পারবে না। যদি কোনো ট্রলার সেখানে জাল ফেলার চেষ্টা করে, তবে তাদের জাল পাথরে আটকে ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, যা শেষ পর্যন্ত জেলেদের ওই এলাকায় মাছ ধরা থেকে বিরত রাখবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট এলাকার সামুদ্রিক জীবন পুনরায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ পাবে বলে আশা করছেন পরিবেশবিদরা। আন্তর্জাতিক মহলে গ্রিনপিসের এই পদক্ষেপ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও, সমুদ্র রক্ষার লড়াইয়ে এটি একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।