আধুনিক কর্পোরেট সংস্কৃতিতে বিনা পারিশ্রমিকে ইন্টার্নশিপ বা আনপেইড ইন্টার্নশিপ একটি বহুল চর্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিজ্ঞতার নামে তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের এই অবৈতনিক শ্রম কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে শুরু হয়েছে বহুমুখী বিতর্ক।
বর্তমান কর্মবাজারে প্রবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে ইন্টার্নশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে গণমাধ্যম, করপোরেট সেক্টর, বিজ্ঞাপন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানে বিনা পারিশ্রমিকে বা নামমাত্র খরচে কাজ করার প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে অভিজ্ঞতা অর্জনের তাগিদে তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশ এই ধরনের অবৈতনিক বা আনপেইড ইন্টার্নশিপ করতে বাধ্য হন। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই চর্চা কি আসলেই দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ, নাকি শ্রমের যথাযথ মূল্য না দিয়ে তরুণদের মেধা ও সময়কে একধরনের শোষণ করার নতুন কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, আনপেইড ইন্টার্নশিপের নেপথ্যে রয়েছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সংকোচন নীতি। যেখানে একজন পূর্ণকালীন কর্মীর কাজ আনপেইড ইন্টার্নদের দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়, সেখানে কাজের মান ও নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তা ছাড়া, আর্থিকভাবে সচ্ছল নয় এমন পরিবারের মেধাবী তরুণদের পক্ষে বিনা পারিশ্রমিকে মাস পর মাস কাজ চালিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলস্বরূপ, এই ধরনের ইন্টার্নশিপ কেবল অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছলদের পক্ষেই সম্ভব হওয়ায় কর্মক্ষেত্রে একধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, যা সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্তরায়।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার এবং উন্নত বিশ্বে আনপেইড ইন্টার্নশিপের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও নীতিমালা থাকলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রয়োগ এখনো অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইন্টার্নশিপ শেষে স্থায়ী চাকরির মিথ্যা আশ্বাসের মাধ্যমে তরুণদের দীর্ঘ সময় অবৈতনিক রাখতে বাধ্য করা হয়। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই ইন্টার্নদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সম্মানী বা ভাতা বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে তরুণদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়।
পরিশেষে, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শ্রম অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আনপেইড ইন্টার্নশিপের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। তরুণ প্রজন্মের মেধা ও কর্মস্পৃহা যেন কেবল শোষণের হাতিয়ার না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলের নজর দেওয়া উচিত। একটি সুশৃঙ্খল ও ন্যায়ভিত্তিক শ্রমবাজার গড়ে তুলতে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে ইন্টার্নশিপ কেবল অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমেই সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সম্মানজনক সুযোগে পরিণত হয়।