রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ / রাত ২:৫০ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়

সুফিবাদ চলচ্চিত্রকে কী দিতে পারে

সুফিবাদ চলচ্চিত্রকে কী দিতে পারে
সুফিবাদ চলচ্চিত্রকে কী দিতে পারে

চলচ্চিত্র দৃশ্যমান জগৎকে ধারণ করে; কিন্তু যখন তা কেবল দৃশ্যমানতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা মানবসত্তার সত্যে পৌঁছাতে পারে না।

চলচ্চিত্র দৃশ্যমান জগৎকে ধারণ করে; কিন্তু যখন তা কেবল দৃশ্যমানতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা মানবসত্তার সত্যে পৌঁছাতে পারে না। অন্যদিকে, সুফিবাদ বলে, যা দৃশ্যমান, তার আড়ালে অর্থের আরেকটি স্তর আছে এবং মানুষ তার প্রকাশিত সত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই অর্থে, সিনেমা ও সুফিবাদের মধ্যকার সম্পর্ক কেবল পর্দায় ধর্মীয় প্রতীক তুলে ধরার চেয়েও অনেক গভীর স্তরে স্থাপিত হতে পারে।

সিনেমাকে তৈরি গল্প বা চিত্র উপহার দেওয়ার আগে সুফি চিন্তাধারা মানুষ, সময়, জগৎ এবং সত্যকে দেখার একটি ভিন্ন পথের প্রস্তাব দেয়। সম্ভবত আসল প্রশ্নটি এটা নয় যে, সিনেমায় সুফিবাদকে কীভাবে উপস্থাপন করা যায়, বরং সিনেমাটি সুফি দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্বকে দেখতে পারে কি না। ‘সুফিবাদ’ শব্দ উচ্চারণ না করে সুফিবাদ চর্চা।

সুফিযাত্রা আমাদের কাছে উপস্থাপিত আধুনিক বিশ্বের ব্যক্তিগত বিকাশের ধারণার মতো নয়। এর পথিকৃৎ কেবল নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণকারী একজন ব্যক্তি হয়ে ওঠেন না। তাকে হয়তো নিজের জানা বিষয়গুলো ভুলে যেতে হয়, নিজের অভিপ্রায়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ঔদ্ধত্যকে চিনতে হয় এবং পৃথিবীকে তার প্রাপ্ত সম্পত্তি হিসেবে নয়, বরং একটি অস্থায়ী আশ্রয়স্থল হিসেবে দেখতে শুরু করতে হয়।

এই কারণে চলচ্চিত্রে আধ্যাত্মিক বিকাশকে সবসময় ঊর্ধ্বমুখী হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। অপেক্ষা করা, ভিন্ন আঙ্গিকে পুনরাবৃত্তি করা এবং অবশেষে নিজের অসহায়ত্বের মুখোমুখি হওয়া—এসবই এই যাত্রার বিভিন্ন পর্যায় হতে পারে। কোনো চরিত্র যে বদলে গেছে, তা বোঝার জন্য তার মুখ থেকে ‘আমি এখন অন্য একজন মানুষ’—এই কথাটি শোনার প্রয়োজন নেই।

যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো, প্রধান চরিত্রের ভেতরের যাত্রাপথটি তুলে ধরতে পারা। চলচ্চিত্র এমন কিছু প্রতীক ব্যবহার করে, যা সুফিবাদের আধ্যাত্মিক দিকটিকে ফুটিয়ে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, আন্দ্রেই তারকোভস্কির ‘Mirror’ ছবিতে প্রকৃতি কেবল মনের কোনো সাধারণ প্রকাশ বা পাঠোদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা কিছু প্রতীকের সমষ্টি নয়।

পানি, আগুন, বাতাস, মরিচা ধরা ধাতু ও কাদা এমন এক উপস্থিতি লাভ করে, যা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে যে, মানুষ এই জগৎকে সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যা করতে পারে। স্মৃতি, স্বপ্ন এবং বর্তমান কোনো স্পষ্ট সীমানা দ্বারা বিভক্ত নয়; অতীত কেবল ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা না থেকে বর্তমানের মধ্যেই পুনরায় আবির্ভূত হয়। অনেকটা সুফিবাদের মতোই।

যদিও ‘মিরর’ সরাসরি কোনো সুফি চলচ্চিত্র নয়, এটি ইঙ্গিত দেয় যে, সত্যকে কেবল যুক্তি দিয়ে উপলব্ধি করা যায় না এবং স্মৃতি ও স্বপ্নও মানব অস্তিত্বের অন্তর্গত এক ধরনের জ্ঞান বহন করতে পারে। চলচ্চিত্রের ভাষায় সুফিবাদকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো তিউনিসীয় পরিচালক নাসের খেমিরের Wanderers of the Desert (১৯৮৪), ‘The Dove's Lost Necklace’ (১৯৯১) এবং ‘Bab'Aziz: The Prince Who Contemplated His Soul’ (২০০৫)। এই তিনটি চলচ্চিত্রেই মরুভূমি কেবল গল্পের পটভূমি নয়, বরং তা আত্ম-অনুসন্ধান এবং অন্তরের বিশ্বাসের দিকে যাওয়ার ক্ষেত্র।

বিশেষ করে ‘বাব’আজিজ’-এ এই যাত্রা, গল্পের মধ্যে গল্প, দরবেশ, সংগীত এবং বিভিন্ন সাক্ষাৎ—চলচ্চিত্রটিকে সুফিবাদের কোনো উপদেশমূলক বিবরণে পরিণত না করেই আধ্যাত্মিক রূপান্তরের সুফি পথের চলচ্চিত্রিক প্রতিরূপ তৈরি করে। খেমিরের চলচ্চিত্র সুফিবাদকে ব্যাখ্যা করে না; বরং এর চিন্তাধারাকে আখ্যানের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘Taste of cherry’ গল্পে জনাব বদি তেহরানের বাইরের শুষ্ক পাহাড়ি রাস্তায় বারবার একই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালান।

তিনি আত্মহত্যা করতে চান এবং এমন একজনকে খুঁজছেন, যে পরে তাকে কবর দেবে। তার গাড়ির ভেতরটা হয়ে ওঠে এক তীব্র স্বীকারোক্তির স্থান, আর বাইরের ঊষর মরুদৃশ্য তার বন্দি মানসিক অবস্থারই এক সম্প্রসারণে পরিণত হয়। তবুও কিয়ারোস্তামি মরুদৃশ্যকে বদির আবেগের প্রতিনিধিত্বকারী একটিমাত্র সরল রূপকে নামিয়ে আনেননি।

তিনি তার পথে আসা মানুষের কণ্ঠস্বর, রাস্তার বাঁক, ধুলা এবং জীবনের অন্যান্য সম্ভাবনাকেও ফ্রেমে নিয়ে আসেন। ঠিক যেন একজন মানুষের জীবনযাত্রা। কিম কি-দুকের ‘Spring, summer, fall, winter and spring’ ছবিতেও হ্রদের ধারের মঠটি ঋতুচক্রের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পরিবর্তনকে নির্মাণ করে।

মঠটির মূল দরোজায় কোনো প্রাচীর নেই এবং এর তীর কোনো রাস্তার সঙ্গে যুক্ত নয়। শৈশব, আকাঙ্ক্ষা, অপরাধবোধ, শাস্তি এবং ফিরে আসা একই প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে সংঘটিত হয়। প্রথম দৃষ্টিতে চলচ্চিত্রটিকে সুফিবাদের সঙ্গে তুলনা করা অর্থহীন মনে হতে পারে, কারণ এর গল্পটি একটি বৌদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে।

তবুও প্রেক্ষাপটটিকে যেভাবে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে, তা সুফি সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত চলচ্চিত্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়। সেমিহ কাপলানোগ্লুর ‘Egg’, ‘Milk’ এবং ‘Honey’ প্রায় একটি অন্তর্মুখী যাত্রার রূপ নেয়। ‘Egg’ গল্পে ইউসুফের কাহিনি কোনো সফল নায়কের উত্থানের মতো নয়।

মায়ের মৃত্যুর পর যখন ইউসুফ তার নিজ শহরে ফিরে আসে, সে বুঝতে পারে যে, যে জীবন সে পেছনে ফেলে এসেছে বলে ভেবেছিল, তা থেকে সে আসলে বেরিয়ে আসতে পারেনি। মায়ের মানত পূরণের এই যাত্রা একটি ছোট বাধ্যবাধকতা হিসেবে শুরু হলেও তা অতীত, মৃত্যু এবং আপনজনদের সঙ্গে এক সংঘাতে পরিণত হয়। ‘Grain’-এ আত্ম-অনুসন্ধানকে আরো সুস্পষ্ট এক আধ্যাত্মিক স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সীমায় পৌঁছানোর পথে এরোল এরিনের সঙ্গে সেমিল আকমানের যাত্রাটি ‘সেয়র-উ সুলুক’-এর এক রূপ ধারণ করে, যা আধুনিক মানুষকে তার নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে বাধ্য করে। সুফি সিনেমার প্রথমেই ঐতিহাসিক পোশাকের সহজ বিকল্প থেকে সরে আসা উচিত। দরবেশের পোশাক, সুর, মোমবাতির আলো এবং ঘূর্ণায়মান দরবেশদের ছবি হয়তো একটি আবহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেগুলো চিন্তার জন্ম দেয় না।

সুফিবাদকে আজকের মহানগরীতে, কোনো অফিস টাওয়ারে, পাতাল রেলে, হাসপাতালে অথবা ঋণের বোঝায় জর্জরিত কোনো ব্যক্তির জীবনেও সমানভাবে খোঁজা যেতে পারে। নফস বা অহং শুধু সুফিদের খানকায় কথা বলে না, বৈঠকের টেবিলে, পারিবারিক খাবারে, শৈল্পিক মহলে এবং এমন কোনো ব্যক্তির ভাষাতেও প্রকাশ পেতে পারে, যিনি বিশ্বাস করেন যে তিনি ভালো কাজ করছেন। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের সিনেমার উচিত নয় আকুল মানুষের জগৎ তৈরি করা।

নিখুঁত মানুষ বলে কিছু নেই। পরিপূর্ণতা কেবল নবীদেরই প্রাপ্য। যা আমাদের মানুষ করে তোলে, তা হলো ভুল করার, তার জন্য অনুশোচনা করার, তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসারে, আমাদের পাপ থেকে পরিশুদ্ধি লাভের ক্ষমতা।

সুফিবাদ পরিপূর্ণ মানুষ নিয়ে নয়, বরং নিজের ত্রুটিবিচ্যুতির সঙ্গে সংগ্রামরত ব্যক্তি নিয়ে কাজ করে। অহংকারী গুরু, সন্দেহে পতিত শিষ্য, টাকার কাছে পরাজিত দরবেশ এবং সত্যের সন্ধানে অন্যদের আঘাতকারী ব্যক্তিরা এই জগতের বাইরের কেউ নন। তৃতীয়ত, চলচ্চিত্রের দর্শকদের বলে দেওয়া উচিত নয় যে তাদের কী বিশ্বাস করতে হবে।

সুফি চলচ্চিত্র কোনো ধর্মীয় উপদেশের চলচ্চিত্র নয়। এটি তৈরি উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে দর্শককে দেখার ও অনুভব করার একটি নতুন পথে আমন্ত্রণ জানায়। এর মানে এই নয় যে এটিকে গুরুগম্ভীর, অন্ধকারাচ্ছন্ন বা দুর্বোধ্য হতে হবে।

যেমন ধীরগতি নিজেই গভীরতা নয়, তেমনি অস্পষ্টতাও সত্যের নিশ্চয়তা দেয় না। দর্শকের কাছ থেকে গোপন রাখা প্রতিটি তথ্যই রহস্য হয়ে ওঠে না; কখনো কখনো এটি কেবল চিত্রনাট্যের একটি ফাঁক ঢেকে রাখে। আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের জন্য মূল্য দিতে হয়।

যদি সিনেমার শেষে প্রধান চরিত্রটি কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে শান্তি খুঁজে পায়, তবে আমরা যা পাই, তা আধ্যাত্মিক বিকাশ নয়, বরং নাটকীয় সুবিধা। প্রকৃত রূপান্তর একজন ব্যক্তির নিজের অহংয়ের সঙ্গে করা বোঝাপড়াকে ভেঙে দেয়। এর ফলে সে হয়তো কোনো পদ, সম্পর্ক, অর্থ বা নিজের সম্পর্কে থাকা অনুকূল ধারণা হারাতে পারে।

এই ক্ষতির জন্য সিনেমার কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো রূপান্তর একজন ব্যক্তিকে সুখী করে না, বরং তাকে আরো খাঁটি করে তোলে। সুফিবাদ চলচ্চিত্রকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটি দিতে পারে, তা নতুন গল্প নয়, বরং দেখার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ পৃথিবীর মালিক নয়, বরং এর অতিথি। সময় আর সামনের দিকে এগিয়ে চলা একটি সরলরেখা থাকে না; অতীত বর্তমানে ফিরে আসে, এবং একই স্থানকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে পুনরায় অনুভব করা যায়। মৃত্যু গল্পের শেষ নয়, বরং একটি দ্বারপ্রান্ত, যা বেঁচে থাকা মানুষদের জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।

স্বপ্ন বাস্তবতার বিপরীত নয়, বরং এর এক অদৃশ্য রূপ। ভালোবাসা অধিকার করা নয়, বরং আপন করে নেওয়া। সম্ভবত সুফি চলচ্চিত্র এমন এক চলচ্চিত্র, যা বোঝে যে, একটি চিত্র সবকিছু তুলে ধরতে পারে না।

কারণ কিছু সত্য ব্যাখ্যার মাধ্যমে নয়, বরং আমাদের অন্তরে জেগে ওঠা নীরবতার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায়। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।

সূত্র: আমার দেশ

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

’ রাষ্ট্রপতি

xwhatsapp-strokecopylinkgoogleAdd Al Jazeera on GoogleinfoHandout picture released by Paraguay's Attorney General's Office shows i...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

ডিপোজিট মানি রিসিপ্ট জমায় সুপ্রিম কোর্ট বারের নতুন নির্দেশনা

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বিভিন্ন খাতে ইস্যু করা ডিপোজিট মানি রিসিপ্ট (জমার রসিদ) ব্যাংকে জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন নির...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

সৌদির জেদ্দায় দুর্ঘটনায় হতাহত ১৩ জন কক্সবাজারের বাসিন্দা

সৌদি আরবের জেদ্দায় শনিবার সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত ১৩ জন বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার বাসিন্দা। জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট থেকে আজ রাতে ...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

প্রস্রাব করার কথা বলে হ্যান্ডকাফসহ পালিয়ে যান ইয়াসিন

পুলিশের হেফাজতে, হাতে হ্যান্ডকাফ। তবু শেষরক্ষা হলো না। প্রস্রাব করার কথা বলে বাইরে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে হ্যান্...

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV