রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ / রাত ১২:৫৭ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়

যেদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়

যেদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়
যেদিন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি রচিত হয়

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পরবর্তী সংকটময় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এটি ছিল ইন্দো-পাক উপমহাদেশের আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক নকশা ও চক্রান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের তূরীভেদী জাতীয় জাগরণ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মু...

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়-পরবর্তী সংকটময় ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এটি ছিল ইন্দো-পাক উপমহাদেশের আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক নকশা ও চক্রান্তের বিপরীতে বাংলাদেশের তূরীভেদী জাতীয় জাগরণ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, পরবর্তী চার বছরে ভুল শাসননীতি, দুঃশাসন, একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) এবং সার্বিক সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার অশুভ আঁতাতের কারণে তা গভীর সংকটে নিপতিত হয়।

শাসকদল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্য, গণতন্ত্র ও জনগণের মৌলিক মানবাধিকার হরণ, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, একদলীয় অগণতান্ত্রিক বাকশালী শাসন, দলীয় পেটোয়া ও রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার, নারকীয় ও বীভৎস হত্যাযজ্ঞ, নতজানু পররাষ্ট্রনীতি, সর্বোপরি মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া ৭ নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল মুজিববাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপশক্তির আধিপত্যবাদকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল এবং বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে এনেছিল স্বাধীনতার ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে।

স্বাধীনতার পর একটি আধিপত্যবাদী শক্তি চায়নি বাংলাদেশ শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। তাই সেনাবাহিনীকে দুর্বল রেখে শক্তিশালী প্যারামিলিটারি ফোর্স রক্ষীবাহিনী গঠন করেছিল। ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র অসন্তোষ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতি তৈরি হয়। .স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, খাদ্যসংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী তাদের সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি উচ্চাভিলাষী ও বিভ্রান্তিকর সেনা অভ্যুত্থান ঘটানো হয়।

৩ নভেম্বরের এই অভ্যুত্থানের পেছনের অদৃশ্য চালিকা শক্তি ছিল বিদেশি আধিপত্যবাদী প্রভুদের গোপন নির্দেশ। দেশপ্রেমী সেনাবাহিনীকে জাতীয়তাবাদী ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি বিশেষ পরাশক্তির অশুভ বলয়ে ঠেলে দেওয়ার কুৎসিত নীলনকশা তৈরি করা হয়েছিল। তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ছিলেন একজন সৎ, নীতিমান, পেশাদার এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় সেনা কর্মকর্তা।

তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করলে তা দেশের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলবে। তিনি চক্রান্তকারীদের অসাংবিধানিক পদক্ষেপে সায় না দেওয়ায় তাঁকে নিজ বাসভবনে গৃহবন্দী করা হয়। .জিয়াউর রহমানের নাম শুনেই দেশবাসী মুক্তির ভরসা পায়, নেমে আসে রাস্তায়।

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘আমজনতা পথের পাশে দাঁড়িয়ে উল্লাস করে, হাততালি দেয় এবং অনেকে জীবনে প্রথমবারের মতো ট্যাংকে বা সেনাবাহিনীর ট্রাকে চড়ে ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ান। ’.বিখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বহুল পঠিত গ্রন্থ বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড-এ তৎকালীন পরিস্থিতির বিবরণ দিয়ে লিখেছেন, ৩ নভেম্বরের ক্যু কোনো জনমুখী অভ্যুত্থান ছিল না; এটি ছিল একটি উচ্চাভিলাষী সামরিক পদক্ষেপ, যা সাধারণ সৈনিকদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। জিয়াউর রহমানের গৃহবন্দিত্ব সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

কারণ, তাঁরা তাঁকে জাতীয় সম্মান ও সামরিক সততার প্রতীক মনে করতেন। ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ বিভিন্ন স্থানে যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, তা সাধারণ সিপাহি এবং এ দেশের ধর্মপ্রাণ দেশপ্রেমী জনগণের মধ্যে এই স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয় যে এ দেশকে আবারও বিদেশি আধিপত্যবাদের উপনিবেশে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে। ৬ নভেম্বর দিবাগত রাতে অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা সেনানিবাসের সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার এক অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে।

সিপাহিরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’ এবং ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, জিয়াউর রহমানের মুক্তি চাই’ স্লোগানে রাজপথ ও ব্যারাক মুখর করে তোলে। অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে সাধারণ সিপাহিরা তাঁদের প্রিয় জেনারেল জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন। .মুক্ত হয়ে জিয়াউর রহমান যখন সেনানিবাসে বের হয়ে এলেন, হাজার হাজার সাধারণ সৈনিক ও সাধারণ মানুষ তাঁকে ঘিরে উল্লাসে ফেটে পড়েন।

জিয়াউর রহমান কোনো ক্ষমতার লোভ বা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে এগিয়ে আসেননি; বরং সিপাহি ও জনতার আস্থাই তাঁকে দেশের সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে স্থান করে দেয়। সেনানিবাসের সিপাহিদের বিপ্লবের খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঢাকায়। সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে আসে।

সিপাহি এবং জনতা একে অপরকে কোলাকুলি করে, ট্যাংকের ওপর উঠে জাতীয় পতাকা ওড়ায় এবং আধিপত্যবাদবিরোধী স্লোগান দেয়। ইতিহাসে সিপাহি ও জনতার এমন রক্তপাতহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত গণবিপ্লবের নজির বিরল। মুক্তিযুদ্ধকালীন জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, উঁচু মানের পেশাদারত্ব, দেশপ্রেম ও সততার কারণে তিনি সেই অস্থির মুহূর্তে সেনা ও অফিসারদের ভরসার চূড়ান্তস্থলে পরিণত হয়েছিলেন।

সে কারণে তাঁকে সেনাসদস্যরা মুক্ত করে অস্থির সময় থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রখ্যাত মার্কিন গবেষক লরেন্স লিফশুলৎজ বাংলাদেশ: দ্য আনফিনিশড রেভোল্যুশন বইয়ে এই অভূতপূর্ব দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ৭ নভেম্বরের ভোরের আলো ফোটার আগেই হাজার হাজার সৈন্য এবং বেসামরিক জনতা ঢাকার রাজপথে নেমে আসে। ট্যাংকগুলো জনগণকে দমন করতে বের হয়নি, বরং সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ফুল দিয়ে সজ্জিত হয়ে রাজপথে নেমেছিল।

জিয়াউর রহমানের নাম শুনেই দেশবাসী মুক্তির ভরসা পায়, নেমে আসে রাস্তায়। ’এমনকি দেশের অভিজাত শ্রেণিও তখন জিয়াউর রহমানের মধ্যেই ভরসা খুঁজে পান। সাবেক জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানের বর্ণনায় তার প্রমাণ মেলে: ‘জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণকে দেশের জন্য বর্তমান অবস্থার সর্বাপেক্ষা কল্যাণকর বলে সকলেই অভিমত প্রকাশ করলাম।

’.২. ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লব কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশকে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের চূড়ান্ত পরাজয়। ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিতে যেভাবে প্রতিবেশী দেশের অনুকম্পা ও আধিপত্য চেপে বসেছিল, ৭ নভেম্বরের বিপ্লব সেই শৃঙ্খলকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয়। এটি বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম অনুঘটক হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে।

৭ নভেম্বরের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দেয় যে এ দেশের জনগণ কারও দাসত্ব মেনে নেওয়ার জন্য লাখো শহীদের রক্তে স্বাধীনতা অর্জন করেনি। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসে বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ নীতি গ্রহণ করে মুসলিম বিশ্ব, চীন ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করেন।

.৭ নভেম্বরের বিপ্লবের পর বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম হয়, তার মূর্তরূপ হলো ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)। বিএনপি কেবল একটি রাজনৈতিক দল ছিল না; এটি ছিল ৭ নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লবের চেতনাসম্ভূত এক বিরাট জাতীয় ঐক্যমঞ্চ।

এটি ছিল এ দেশের বামপন্থী, ডানপন্থী, মধ্যপন্থী এবং ঐতিহ্যবাহী দেশপ্রেমী রাজনৈতিক শক্তিকে একই পতাকাতলে নিয়ে আসার এক ঐতিহাসিক প্রয়াস। .৩.৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লব জিয়াউর রহমানকে এক ঐতিহাসিক জাতীয় দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়। দেশ যখন চরম অরাজকতা, অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং চরম রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল, তখন রাষ্ট্র পরিচালনার ভার গ্রহণ করা কোনো বিলাসিতা ছিল না, ছিল এক কঠিন ব্রত।

জিয়াউর রহমান প্রথমে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে জাতীয় সংহতি রক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পুনর্বাসনের স্বার্থে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে একটি টেকসই রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য।

তাই তিনি দ্রুত দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। .প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান তাঁর গ্রন্থ বাংলাদেশ পলিটিকস: প্রবলেমস অ্যান্ড ইস্যুজ-এ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি অনুধাবন করেছিলেন, সামরিক শাসনজনিত বৈধতা ক্ষণস্থায়ী। গণভোট আয়োজন, স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা এবং অবশেষে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ের জন্য একটি রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি তাঁর শাসনকে বেসামরিকীকরণ করেন এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিয়াউর রহমান ব্যাপক জনভোটে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সিপাহি-জনতার বিপ্লবের জন–আকাঙ্ক্ষাকে সরাসরি গণতান্ত্রিক বৈধতায় রূপান্তর করেন। শহীদ জিয়া উপলব্ধি করেছিলেন যে ভৌগোলিক অবস্থান, ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতির অনন্য মিশ্রণে গঠিত এ ভূখণ্ডের মানুষের আসল পরিচয় হলো ‘বাংলাদেশি’।

আওয়ামী লীগের সংকীর্ণ ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ যা এ দেশের অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে বাদ দিয়েছিল এবং বাংলাদেশকে একটি বিশেষ প্রতিবেশীর সাংস্কৃতিক বলয়ে আটকে রাখতে চেয়েছিল—তার বিপরীতে জিয়ার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এ দেশের সর্বস্তরের মানুষকে একটি শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ করে এবং জাতীয় ঐক্যের সূচনা করে। তৎকালীন রাজনৈতিক পটভূমিতে খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী ড. আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে তাঁর এক নিবন্ধে লিখেছেন, জিয়াউর রহমান কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ জাতিকে ভৌগোলিক সীমানা, সার্বভৌম গৌরব এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয় এনে দেয়, যা বিদেশি সাংস্কৃতিক আধিপত্য ছিন্ন করে সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। বিএনপির ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল এ দেশের অর্থনীতির প্রতিটি খাতকে স্বনির্ভর করার এক অমূল্য দলিল।

এ কর্মসূচির মাধ্যমেই কৃষিতে বিপ্লব, শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি, তৈরি পোশাক শিল্প খাতের সূচনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মতো মহতী উদ্যোগগুলো গৃহীত হয়েছিল, যা আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। .আজকে যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে বাংলাদেশকে অস্থির করতে, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে দেশি–বিদেশি যড়ন্ত্রকারীরা নানামুখী চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে, তখন ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার, ধারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সিপাহি-জনতার বিপ্লবের এই মহান বার্তা প্রতিটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ুক।

.৭ নভেম্বরের বিপ্লবের পর জেনারেল জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশের শাসনভার লাভ করেছিলেন, সেই বাংলাদেশ ছিল তলাবিহীন ঝুড়ি নামে আখ্যায়িত এক অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া রাষ্ট্র। কিন্তু তাঁর কঠোর পরিশ্রম, সততা এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই একটি স্বনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত হতে শুরু করে। জিয়াউর রহমান অনুধাবন করেছিলেন যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন।

তিনি খাল খনন করে তার মাধ্যমে আনীত পানি দিয়ে কৃষিবিপ্লব ঘটান, গ্রামে গ্রামে গিয়ে ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ পরিচালনা করেন এবং এ দেশের কৃষককে উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর আমলেই বাংলাদেশ খাদ্যঘাটতি পূরণ করে বিদেশে চাল রপ্তানির যোগ্যতা অর্জন করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থানকে তিনি শীর্ষে নিয়ে যান।

ইসলামি সম্মেলন সংস্থায় জিয়াউর রহমান ওআইসি আল-কুদস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ মধ্যস্থতায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার যে স্বপ্ন জিয়াউর রহমান দেখেছিলেন, তার ফলেই পরে গঠন করা হয় সার্ক। ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়।

এটা ছিল জিয়ার দূরদর্শী কূটনৈতিক সাফল্যের এক জ্বলন্ত প্রমাণ। .৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মূল চেতনা ছিল—বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা, আধিপত্যবাদকে প্রতিহত করা এবং গণমানুষের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। শহীদ জিয়াউর রহমানের বিএনপি এই চেতনাকেই তাদের মূল রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছে।

আজকের প্রেক্ষাপটে, যখনই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়, যখনই কোনো অগণতান্ত্রিক ও আধিপত্যবাদী শক্তি জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে দেশকে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়, তখনই ৭ নভেম্বরের বিপ্লব আমাদের প্রেরণা জোগায়। বিএনপির অদম্য যাত্রা প্রমাণ করেছে যে এ দেশের মাটিতে আধিপত্যবাদের কোনো স্থায়ী স্থান নেই। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব এবং আমাদের জননেতা তারেক রহমানের দূরদর্শী নির্দেশনায় বিএনপি সর্বদা দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।

.আজ ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ৫১ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে আমাদের শপথ নিতে হবে যে ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতা যে ঐক্যের বিনিময়ে এবং যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্যের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছিল, আমরা তা কোনো অবস্থাতেই ক্ষুণ্ন হতে দেব না। ৭ নভেম্বর আমাদের শেখায় যে জনগণের ঐক্য এবং সেনাবাহিনীর দেশপ্রেম যদি একসুতোয় গাঁথা হয়, তবে পৃথিবীর কোনো আধিপত্যবাদী শক্তিই একটি রাষ্ট্রকে গোলাম বানিয়ে রাখতে পারে না। আজকে যখন দেশের ভেতরে ও বাইরে থেকে বাংলাদেশকে অস্থির করতে, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে দেশি–বিদেশি যড়ন্ত্রকারীরা নানামুখী চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে, তখন ৭ নভেম্বরের বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার, ধারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য ও স্থায়ী কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)মতামত লেখকের নিজস্ব।

সূত্র: প্রথম আলো

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

ত্রিপল মার্ডারের সেই মোতাহার জুলাই হত্যা মামলায় ফের রিমান্ডে

রাজধানীর মৌচাক-মালিবাগে আলোচিত ‘ট্রিপল মার্ডার’-এর আসামি মোতাহার হোসেনকে (৬৬) জুলাই হত্যায় মামলায় ফের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

কে ‘অবিশ্বাস্য’ বললেন সিমন্স, দিলেন পরিণত হওয়ার স্বীকৃতি

মিরপুরের হতাশা পেছনে ফেলে সিলেটে নিজেকে নতুন করে চিনিয়েছেন তাওহীদ হৃদয়। আগের টেস্টে ব্যাট হাতে ব্যর্থ হওয়ার পর তাকে নিয়ে কম সমালোচ...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

কান্নায় শেষ মৌলভীবাজারের তিন দিনের জেলা ইজতেমা

মৌলভীবাজারে তিন দিনব্যাপী জেলা ইজতেমা আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। শনিবার (৭ নভেম্বর) বেলা ১১টার দিকে কাকরাইলের মুরুব্বি ম...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

মালয়েশিয়ায় ৩২ হাজারের বেশি নিয়োগকর্তা ও অবৈধ অভিবাসীকে জরিমানা

মালয়েশিয়ায় অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের দায়ে ১০ মাসে ৩২ হাজারের বেশি নিয়োগকর্তা ও অবৈধ অভিবাসীর কাছ থেকে ৯১ কোটি ৭৮ লাখ রিঙ্গিত জরিমানা আদা...

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV