বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘমেয়াদী উত্তেজনা নিরসনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে। সোমবার লেনদেন চলাকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয়ই তাদের মূল্যের একটি বড় অংশ হারিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক এই তৎপরতা সফল হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে, যা দাম কমার পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
সোমবারের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুডের দাম ৬.১ শতাংশ কমেছে। এর ফলে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দাঁড়িয়েছে ১০৬.৫৪ ডলারে। দিনের শুরুতে কূটনৈতিক আলোচনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এই নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়। লেনদেনের শুরুর দিকে দাম প্রায় চার শতাংশের মতো কমলেও দিন বাড়ার সাথে সাথে পতনের মাত্রা আরও তীব্র হয়। বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা ফলপ্রসূ হলে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা হ্রাস পাবে, যা তেলের বাজারে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বয়ে আনতে পারে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামেও বড় ধরনের ধস নেমেছে। সোমবার ডব্লিউটিআই তেলের দাম ৬.৩ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৯৭.৫৬ ডলারে নেমে এসেছে। তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসাকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতির চাপে থাকা দেশগুলোর জন্য জ্বালানি তেলের এই দরপতন কিছুটা স্বস্তি নিয়ে আসতে পারে। ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং দেশটির ওপর থেকে যদি কোনোভাবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় বা আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনার অবসান ঘটে, তবে বাজারে তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতময় পরিস্থিতির কারণে গত কয়েক মাস ধরেই তেলের বাজার ছিল অত্যন্ত অস্থির। বিশেষ করে লোহিত সাগর এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার ফলে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে আলোচনার এই সংবাদ বাজারের সেই ঝুঁকি প্রিমিয়াম বা 'রিস্ক প্রিমিয়াম' কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেলের দামের এই পতন মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার ফল। যখনই বড় কোনো সংঘাতের সম্ভাবনা কমে আসে, তখনই ফটকা ব্যবসায়ীরা তাদের মজুদ করা তেল বাজারে ছাড়তে শুরু করেন, যা দামকে নিচের দিকে ঠেলে দেয়।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দামের এই পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি এই শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত সফল হয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চেইন আরও শক্তিশালী হবে। তবে বাজারের একটি অংশ এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাদের মতে, আলোচনার প্রস্তাব বা সম্ভাবনা তৈরি হওয়া মানেই চূড়ান্ত সমাধান নয়। যদি কোনো কারণে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়, তবে তেলের দাম আবারও লাফিয়ে বাড়তে পারে। আপাতত ব্রেন্ট ক্রুড ১০৬ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ৯৭ ডলারের ঘরে অবস্থান করায় বৈশ্বিক পরিবহন ও উৎপাদন খাতে খরচের চাপ কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। সোমবারের এই দরপতন গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তেলের বাজারে সবচেয়ে বড় একক দিনের পতন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
পুরো ঘটনাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, বিষয়টির গতিপ্রকৃতি নীতিনির্ধারক ও সাধারণ পাঠকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঘটনার সূত্রপাত থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এ সংক্রান্ত পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য ও অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করা হচ্ছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!