সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই ভিত্তিক বিমান সংস্থা ফ্লাইদুবাইয়ের একটি ফ্লাইটে মাঝআকাশে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ কুঠার হামলার ঘটনায় অসীম সাহসিকতা প্রদর্শনের জন্য দুই পাইলটকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা হয়েছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে ইসরায়েলের তেল আবিবগামী এফজেড১০৭৩ ফ্লাইটে এই নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটে। বিমানে থাকা সহ-পাইলট হঠাৎ করেই প্রধান পাইলট বা ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর কুঠার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই সংকটময় মুহূর্তে বিমানের অতিরিক্ত ক্রু হিসেবে ভ্রমণরত দুই পাইলট রোয়ান টুথ এবং হেনসন স্টিভেন অত্যন্ত দ্রুততার সাথে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেন এবং বিমানটিকে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন। গত ২৭ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার তাদের এই বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রীয় পদক প্রদান করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, বোয়িং ৭৩৭ বিমানটি যখন মাঝআকাশে অবস্থান করছিল, তখন ওমানি নাগরিক ও সহ-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি ককপিটের ভেতরে থাকা জরুরি কুঠার দিয়ে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকে আক্রমণ করেন। কুঠারের আঘাতে ক্যাপ্টেনের মাথায় গুরুতর জখম হয় এবং তিনি প্রচুর রক্তক্ষরণজনিত কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এই আকস্মিক হামলার ফলে বিমানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে এবং মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি প্রায় ১৬ হাজার ফুট নিচে নেমে আসে। এমন এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিমানের রাডারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে বিমানে অতিরিক্ত ক্রু হিসেবে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকান পাইলট রোয়ান টুথ এবং ফিজির পাইলট হেনসন স্টিভেন ককপিটে প্রবেশ করেন। তারা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে আক্রমণকারীকে প্রতিহত করেন এবং বিমানের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেন।
রোয়ান টুথ দক্ষিণ আফ্রিকার কিম্বার্লির বাসিন্দা এবং তিনি দেশটির প্রয়াত প্রখ্যাত ক্রিকেটার ব্যারি টুথের ছেলে। ব্যারি টুথ গত বছর মৃত্যুবরণ করেন। রোয়ান টুথ ২০২৩ সালে ফ্লাইদুবাইয়ে যোগদানের আগে দক্ষিণ আফ্রিকার এয়ারলিংক এয়ারলাইন্সে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে হেনসন স্টিভেন ফিজির নাগরিক এবং তিনি এর আগে ফিজি এয়ারওয়েজে কাজ করেছেন। এই দুই অভিজ্ঞ পাইলট তাদের পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানটিকে সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করাতে সক্ষম হন। তাদের এই বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে বিমানে থাকা শত শত যাত্রীর প্রাণ রক্ষা পায়। পরবর্তীতে যাত্রীদের জন্য বিকল্প বিমানের ব্যবস্থা করে তাদের গন্তব্যে পাঠানো হয়।
এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান পাইলটদের বিশেষ সম্মাননা প্রদানের ঘোষণা দেন। গত ২৭ অক্টোবর দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের হাতে ‘ফার্স্ট ক্লাস অর্ডার অফ জায়েদ টু’ পদক তুলে দেন। গুরুতর আহত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারকেও তার অসীম ধৈর্যের জন্য একই সম্মাননায় ভূষিত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই পদকটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম শীর্ষ বেসামরিক সম্মাননা, যা সাধারণত বিশেষ কোনো বীরত্বপূর্ণ বা সেবামূলক কাজের জন্য প্রদান করা হয়।
ফ্লাইদুবাই কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এই ঘটনার পর বিমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। ককপিটের ভেতরে থাকা জরুরি সরঞ্জাম কীভাবে একজন ক্রু সদস্যের দ্বারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে রোয়ান টুথ এবং হেনসন স্টিভেনের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও সাহসিকতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের দেশের কৃতি সন্তানের এই সাফল্যে গর্ব প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে প্রয়াত ক্রিকেটার ব্যারি টুথের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, রোয়ান তার বাবার মতোই সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। এই ঘটনাটি এভিয়েশন ইতিহাসে একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে থেকে যাবে, যেখানে সহকর্মীর প্রাণঘাতী হামলার মুখেও অন্য পাইলটরা পেশাদারিত্ব বজায় রেখে শত শত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!