রাজধানীর ব্যস্ততম যান্ত্রিক জীবনের ঘূর্ণিপাকে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া এক স্বনির্ভর নারী মিমি। বনশ্রীর একটি ছোট ফ্ল্যাটে একাকী বসবাস করা এই নারী দীর্ঘ নয় বছর ধরে একটি ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারে দায়িত্বশীল পদে কর্মরত আছেন। সপ্তাহের ছয় দিন সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে পৌনে নয়টার মধ্যে অফিসে পৌঁছানোর যে নিরন্তর লড়াই, তাতে শুক্রবারের সকালটি মিমির কাছে এক টুকরো অমৃতের মতো। এই একটি দিন তিনি নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন গভীর ঘুম আর তন্দ্রার আবেশে। তবে এবারের এক অলস শুক্রবারের সকালে মিমির সেই প্রিয় ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ফোন কলে। ফোনের ওপাশে ছিলেন তার সাবেক স্বামী পলাশ। বিচ্ছেদের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পলাশের সেই পরিচিত মায়াবী কণ্ঠস্বর মিমিকে এক মুহূর্তের জন্য অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। পলাশ ও মিমির দীর্ঘ এক যুগের সংসার ভেঙে গিয়েছিল মূলত পলাশের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং দীর্ঘদিনের মাদকাসক্তির কারণে। পলাশ ছিলেন একজন স্বপ্নবিলাসী, অলস এবং কল্পনাপ্রবণ মানুষ, যিনি জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি।
পলাশের সাথে মিমির সম্পর্কের রসায়ন ছিল বেশ জটিল। পলাশ মিমিকে মনেপ্রাণে ভালোবাসলেও সংসারের ভার বহনে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যর্থ। বিয়ের অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মিমি আবিষ্কার করেছিলেন পলাশের গাঁজা সেবনের অভ্যাস। গভীর রাতে কাঁচি দিয়ে গাঁজা মিহি করার সেই দৃশ্যগুলো আজও মিমির স্মৃতিতে অমলিন। অনেক চেষ্টা করেও মিমি তাকে এই পথ থেকে ফেরাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত তাদের বিচ্ছেদ ঘটে এবং কোনো সন্তান না থাকায় বিচ্ছেদের প্রক্রিয়াটি ছিল কিছুটা সহজ। তবে বিচ্ছেদের পর মিমি যখন ঢাকা শহরে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন এবং বাবা-মাকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন, পলাশ তখন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন তার গ্রামের বাড়িতে। বর্তমানে তিনি গ্রামের নিসর্গে ঘুরে বেড়ান এবং নিজের খেয়ালখুশিমতো জীবন অতিবাহিত করেন। মিমি মাঝেমধ্যে পলাশের এই নির্ভার জীবন দেখে কিছুটা হিংসেও বোধ করেন। পলাশ এখন গ্রামে এক কিশোরী মেয়ের প্রেমে পড়েছেন এবং সেই নতুন প্রেমের গল্প তিনি অকপটে শেয়ার করেন মিমির সাথেই। মিমি এতে রাগ না করে বরং পলাশের একাকীত্ব ঘুচেছে ভেবে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করেন।
এবারের ফোন কলের উদ্দেশ্য ছিল কিছুটা ভিন্ন এবং অদ্ভুত। পলাশ তার নতুন প্রেমিকার জন্য একটি বিশেষ নকশার কানের দুল খুঁজছেন। মিমির ফেসবুক পোস্ট থেকে দেখা একটি ময়ূরের নকশা করা এবং ছোট লাল পাথর বসানো দুল পলাশের খুব পছন্দ হয়েছে। তিনি মিমিকে অনুরোধ করেন ঢাকা থেকে সেই দুলটি সংগ্রহ করে দেওয়ার জন্য। পলাশের এই আবদার মিমির কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলেও তিনি তা হাসিমুখে গ্রহণ করেন। পলাশ জানান যে বর্তমানে তার হাতে টাকা নেই, তবে টাকা পেলেই তিনি বিকাশে পাঠিয়ে দেবেন। মিমি তাকে অভয় দিয়ে বলেন যে দুলটি তিনি নিজেই উপহার হিসেবে কিনে দেবেন। পলাশের এই শিশুসুলভ আচরণ এবং তার উচ্ছ্বাস মিমিকে আবেগপ্রবণ করে তোলে। পলাশ যখন খুশি থাকেন, তখন তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষে পরিণত হন এবং তার সেই আনন্দ মিমিকেও স্পর্শ করে। পলাশ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন যে তাদের বিয়ে ভেঙে গেলেও বন্ধুত্ব কখনো ভাঙবে না।
মিমি কেন এখনো নতুন কোনো সম্পর্কে জড়াননি, তা নিয়ে তার পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের চাপের শেষ নেই। অনেকে তাকে নতুন করে সংসার শুরু করার পরামর্শ দিলেও মিমি যেন এই স্বাধীন ও সঙ্গীহীন জীবনের প্রেমে পড়ে গেছেন। পলাশের সাথে কাটানো দীর্ঘ সময় তাকে হয়তো সম্পর্কের প্রতি এক ধরনের অনীহা এনে দিয়েছে। তবে মাঝেমধ্যে নির্জন রাতে তিনি একজন দায়িত্ববান জীবনসঙ্গীর অভাব বোধ করেন, যিনি পলাশের মতো শুধু ভালোবাসবেনই না, বরং দায়িত্বও নিতে জানবেন। ফোনের ওপাশে পলাশ যখন দুল পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা, তখন মিমির চোখে নোনা জলের জোয়ার নামে। মুখে হাসি থাকলেও তার চোখ অশ্রুতে টইটম্বুর হয়ে ওঠে। পলাশ মিমির চোখের জল সহ্য করতে পারতেন না, কিন্তু বিচ্ছেদের এই দূরত্বে তিনি মিমির সেই নীরব কান্না টেরই পাননি। এক বুক হাহাকার আর অম্লমধুর স্মৃতি নিয়ে মিমি আবারও তার একাকী জীবনের বাস্তবতায় ফিরে আসেন, যেখানে সাবেক স্বামীর নতুন প্রেমিকার জন্য উপহার কেনার এক বিচিত্র দায়িত্ব তার কাঁধে চেপেছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!