ফরিদপুরের ভাঙ্গায় এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাকে প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে বর্বরোচিত নির্যাতন ও অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী বাহাউদ্দিন শেখ (৩৪) ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ভাঙ্গা শাখার কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে ভাঙ্গা ইন্টারচেঞ্জ বা এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন এলাকায় এই ঘটনা ঘটে, যা বর্তমানে স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, অপহরণকারীরা তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম নির্যাতন করে তার কাছ থেকে এবং তার পরিবারের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। এই ঘটনায় ভাঙ্গা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, বাহাউদ্দিন শেখ তার কর্মস্থল ভাঙ্গা থেকে সাপ্তাহিক ছুটিতে গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার নিজ বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। তিনি ভাঙ্গা গোলচত্বর এলাকায় যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এই সময় একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকার তার সামনে এসে থামে এবং চালক তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সাধারণ যাত্রী হিসেবে তিনি সেই গাড়িতে ওঠেন, কিন্তু গাড়িতে আগে থেকেই যাত্রীবেশে ওত পেতে থাকা আরও ৩-৪ জন ব্যক্তি তাকে জিম্মি করে ফেলে। গাড়িটি চলতে শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই অপহরণকারীরা তাদের আসল রূপ ধারণ করে। তারা বাহাউদ্দিনের চোখ বেঁধে ফেলে এবং তাকে মারধর করতে শুরু করে। এক পর্যায়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তার কাছে থাকা নগদ টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী দাবি করা হয়।
অপহরণকারীরা বাহাউদ্দিনের কাছে থাকা মানিব্যাগ, মোবাইল ফোন এবং এটিএম কার্ড কেড়ে নেয়। তাকে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে এটিএম কার্ডের পিন নম্বর বলতে বাধ্য করা হয়। এরপর অপহরণকারীরা বিভিন্ন বুথ থেকে টাকা উত্তোলন করে এবং তার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহার করে আরও অর্থ স্থানান্তর করে। শুধু তাই নয়, অপহরণকারীরা তার পরিবারের সদস্যদের ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে অপহরণকারীদের দেওয়া বিভিন্ন বিকাশ ও নগদ নম্বরে টাকা পাঠাতে বাধ্য হন। সব মিলিয়ে প্রায় এক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর গভীর রাতে তাকে একটি নির্জন স্থানে ফেলে রেখে অপহরণকারীরা পালিয়ে যায়। ভুক্তভোগী ব্যাংক কর্মকর্তা কোনোমতে স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার হন এবং পরবর্তীতে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
এই বর্বরোচিত ঘটনার পর বাহাউদ্দিন শেখ ভাঙ্গা থানায় উপস্থিত হয়ে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে একটি অভিযোগ দাখিল করেন। তিনি জানান, অপহরণকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই কাজ করেছে এবং তাদের কাছে দেশীয় অস্ত্র ছিল। তারা তাকে হত্যার ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রেখেছিল। এই ঘটনায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন যে, পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে। অপরাধীদের ব্যবহৃত প্রাইভেটকারটি শনাক্ত করতে হাইওয়ে এবং এক্সপ্রেসওয়ের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পুলিশ ধারণা করছে, এটি একটি পেশাদার অপহরণকারী চক্রের কাজ যারা নিয়মিতভাবে এই রুটে সাধারণ যাত্রীদের টার্গেট করে থাকে।
ফরিদপুরের এই ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। বিশেষ করে রাতের বেলা এক্সপ্রেসওয়ে বা মহাসড়কে যাতায়াতকারী যাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, মহাসড়কে পুলিশের টহল আরও জোরদার করা প্রয়োজন এবং এই ধরনের অপরাধী চক্রকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। ব্যাংক কর্মকর্তা বাহাউদ্দিনের ওপর এই হামলা কেবল একটি ছিনতাই বা অপহরণের ঘটনা নয়, বরং এটি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশ আশ্বাস দিয়েছে যে, খুব শীঘ্রই অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের মুখোমুখি করা হবে এবং লুণ্ঠিত অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা চালানো হবে। বর্তমানে ভুক্তভোগী ব্যাংক কর্মকর্তা তার নিজ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!