ভারতের রাজধানী দিল্লির রাজপথ আজ এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংঘাতের সাক্ষী হয়েছে, যেখানে বিরোধী ইন্ডিয়া জোট এবং ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি পালন করেছে। একদিকে বিরোধী শিবির ভোটার তালিকায় অনিয়ম এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার প্রতিবাদে রামলীলা ময়দানে বিশাল সমাবেশের ডাক দেয়, অন্যদিকে বিজেপি ১৯৮৪ সালের শিখ দাঙ্গার বার্ষিকী সামনে রেখে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে। দিল্লির মিন্টো রোড-কনট প্লেস জংশন থেকে শুরু হওয়া রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ‘চলো দিল্লি’ পদযাত্রাটি রামলীলা ময়দানে গিয়ে শেষ হয়, যেখানে বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। এই পদযাত্রার মূল লক্ষ্য ছিল মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা।
রামলীলা ময়দানের বিশাল জনসভায় লোকসভার বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী অভিযোগ করেন যে, ভারতে গত কয়েক বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে ভোট চুরি করা হচ্ছে। তিনি মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের উদাহরণ টেনে বলেন যে, ইভিএম কারচুপি এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা ভুয়া নাম অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে জনগণের রায় চুরি করা হয়েছে। রাহুল গান্ধী আরও অভিযোগ করেন যে, তাদের পদযাত্রা বাধাগ্রস্ত করতে বিজেপি কনট প্লেসের দোকানপাট জোরপূর্বক বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, ইন্ডিয়া জোটের পক্ষ থেকে সমর্থকদের ওই এলাকায় কেনাকাটা করার অনুরোধ জানানো হয়েছিল যাতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা উপকৃত হন, কিন্তু বিজেপি সরকার ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়ে দোকানগুলো বন্ধ করে দিয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই সমাবেশে অংশ নিয়ে সোনিয়া গান্ধীকে ‘নেতা’ এবং রাহুল গান্ধীকে ‘তরুণ নেতা’ হিসেবে সম্বোধন করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন যে, তারা বাংলাকে লুণ্ঠন করতে দেবেন না এবং দিল্লির রাজপথ থেকে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্লোগান তোলেন যে, বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতেই হবে। অন্যদিকে আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব রামলীলা ময়দানকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে বলেন, এই ময়দান সাধারণত রামায়ণের জন্য পরিচিত হলেও আজ এখানে ভোট চোরদের বিরুদ্ধে ‘মহাভারত’ শুরু হয়েছে। তিনি মহাভারতের শকুনির পাশা খেলার সাথে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনা করে বলেন যে, ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
বিরোধীদের এই সমাবেশের কড়া সমালোচনা করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডা একে ‘নৈরাজ্য সৃষ্টির সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন যে, যারা বারবার জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তারা এখন গণতন্ত্রের নামে নাটক করছে। নাড্ডা অভিযোগ করেন যে, রাহুল গান্ধীর রাজনীতির মডেল হলো প্রথমে মিথ্যা ছড়ানো, তারপর রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তির সহায়তায় নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করা। তিনি আরও বলেন যে, ১ নভেম্বরের এই দিনটি ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত অধ্যায় কারণ এই দিনে কংগ্রেসের মদতপুষ্ট গুন্ডারা শিখ সম্প্রদায়ের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ চণ্ডীগড়ে এক অনুষ্ঠানে বলেন যে, শিখ দাঙ্গার বার্ষিকীতে রাহুল গান্ধীর এই সমাবেশ শিখ সম্প্রদায়ের ক্ষতে লবণের ছিটা দেওয়ার মতো। বিজেপি নেতা হরদীপ সিং পুরী পশ্চিম দিল্লির শিখ অধ্যুষিত হরি নগর এলাকায় একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দেন, যা তিলক নগর মেট্রো স্টেশনে গিয়ে শেষ হয়। হরিয়ানার রোহতকেও বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন ‘লোকতন্ত্র বাঁচাও, অরাজকতা হটাও’ মিছিলের নেতৃত্ব দেন। দিল্লির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রায় ১০,০০০ পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। যদিও ইন্ডিয়া জোট ১০ লাখ মানুষের সমাগমের আশা করেছিল, তবে রামলীলা ময়দানের ধারণক্ষমতা নিয়ে নানা আলোচনা ছিল। সব মিলিয়ে দিল্লির এই রাজনৈতিক উত্তাপ ভারতের আগামী দিনের রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ নির্দেশ করছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!