রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ / রাত ২:২৮ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়

কেমন ছিল নবীজির ঠিক পরের প্রজন্ম

কেমন ছিল নবীজির ঠিক পরের প্রজন্ম
কেমন ছিল নবীজির ঠিক পরের প্রজন্ম

সাহাবিদের পর ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালি ও মর্যাদাপূর্ণ প্রজন্ম হলো ‘তাবেয়ি’দের যুগ। তাবেয়ি বলা হয় এমন মুসলিমকে, যিনি ইমান অবস্থায় অন্তত একজন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং ইমানের সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করেছেন।নবীজির সরাসরি সান্নিধ্য না পেলেও তাঁরা সাহাবিদের জীবনাদর্শ এত নিবিড়...

সাহাবিদের পর ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালি ও মর্যাদাপূর্ণ প্রজন্ম হলো ‘তাবেয়ি’দের যুগ। তাবেয়ি বলা হয় এমন মুসলিমকে, যিনি ইমান অবস্থায় অন্তত একজন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছেন এবং ইমানের সঙ্গেই মৃত্যুবরণ করেছেন। নবীজির সরাসরি সান্নিধ্য না পেলেও তাঁরা সাহাবিদের জীবনাদর্শ এত নিবিড়ভাবে ধারণ করেছিলেন যে, তাঁদের যুগটি জ্ঞান, তাকওয়া ও দুনিয়াবিমুখতার এক অনন্য আদর্শ হয়ে আছে।

মহানবী (সা.) তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ হলো আমার যুগের মানুষ (সাহাবি), এরপর তাদের পরের যুগের মানুষ (তাবেয়ি), এরপর তাদের পরের যুগের মানুষ। ’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৫১)তাবেয়িদের জীবনযাপনের প্রধান কয়েকটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো। .একটি মাত্র হাদিস শোনার জন্য তাঁরা মাসের পর মাস উটের পিঠে চড়ে মরুভূমি পাড়ি দিতেন।

মদিনা, মক্কা, কুফা, বসরা ও সিরিয়ায় সাহাবিদের ঘিরে তাঁরা জ্ঞানের বিশাল মজলিশ গড়ে তুলেছিলেন। .তাবেয়িদের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্রত ছিল সাহাবিদের বুক থেকে নবীজির হাদিস ও সুন্নত সংগ্রহ করা। একটি মাত্র হাদিস শোনার জন্য তাঁরা মাসের পর মাস উটের পিঠে চড়ে মরুভূমি পাড়ি দিতেন।

মদিনার তাবেয়ি সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব (রহ.) বলতেন, ‘আমি একটি মাত্র হাদিস সংগ্রহের জন্য দিন-রাত অবিরাম সফর করতাম। ’ (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৫/১২০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯০)তাঁদের এই অক্লান্ত পরিশ্রম ও নিখুঁত স্মৃতিশক্তির কারণেই আজ আমরা ইসলামের বিশুদ্ধ জ্ঞানভান্ডার লাভ করেছি। .ইমাম জুওয়াইনির চিন্তায় আলেমদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা.তাবেয়িদের যুগে ইসলামি সাম্রাজ্য রোম থেকে পারস্য পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল এবং চারদিকে ধনসম্পদের প্রাচুর্য ছিল।

কিন্তু তাবেয়িরা সেই জাগতিক চাকচিক্য থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত রেখেছিলেন। তাঁরা সাহাবিদের মতো অত্যন্ত সাদাসিধে খাবার খেতেন এবং সাধারণ পোশাক পরতেন। তাবেয়ি হাসান বসরি (রহ.) তাঁদের দুনিয়াবিমুখতার নিখুঁত চিত্র তুলে ধরে বলেছিলেন, ‘আমি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ৭০ জন সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছি; তোমরা যদি তাঁদের দেখতে, তবে তাঁদের পাগল ভাবতে।

আর তাঁরা যদি তোমাদের দুনিয়াপ্রীতি দেখতেন, তবে বলতেন—এদের পরকালে কোনো অংশ নেই। ’ (আল-ইসফাহানি, হিলয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া, ২/১৩৪, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৫)সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তা গরিবদের বিলিয়ে দিতেন এবং নিজেরা আধ্যাত্মিক স্বস্তিতে জীবন কাটাতেন। .আমি যখন নামাজে দাঁড়াব, তখন তোমরা আমার পা কেটে ফেলো, আমি টেরও পাব না।

তাবেয়ি উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রহ.).তাবেয়িদের রাতগুলো কাটত আল্লাহর সামনে জায়নামাজে কান্নাকাটি করে। দিনে তাঁরা কর্মব্যস্ত থাকলেও রাতে তাঁরা ছিলেন একনিষ্ঠ সাধক। ওয়ায়েস আল-কারানি, জয়নুল আবিদিন বা উরওয়া ইবনে জুবায়েরের মতো তাবেয়িদের ইবাদতের ঘটনা ইতিহাসে প্রবাদ হয়ে আছে।

উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রহ.) যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাঁর পায়ে পচন ধরে এবং চিকিৎসকেরা তা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি অজ্ঞান করার ওষুধ খেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যখন নামাজে দাঁড়াব, তখন তোমরা আমার পা কেটে ফেলো, আমি টেরও পাব না। ’ (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৪৩০, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)নামাজে আল্লাহর প্রতি তাঁদের এই গভীর মনোযোগ ও তাকওয়া আজকের যুগে কল্পনারও অতীত।

.প্রাচীন আলেমদের ‘মাজহাব’ পরিবর্তনের ইতিহাস.ইবাদত ও ইলম চর্চায় মগ্ন থাকলেও তাবেয়িরা কখনোই অন্যের ওপর নির্ভরশীল বা কর্মবিমুখ ছিলেন না। তাঁরা নিজেদের হাতে উপার্জন করতেন এবং হালাল রিজিক অন্বেষণকে ইবাদতের অংশ মনে করতেন। তাঁরা উপার্জনের ক্ষেত্রে সততার এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যে, বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ থাকলে তাঁরা বিপুল অংকের ব্যবসাও ছেড়ে দিতেন।

তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) কাপড় ও তেলের ব্যবসা করতেন। একবার তিনি ৪০ হাজার দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) মূল্যের তেল বাকিতে ক্রয় করেন। তেলের পাত্রগুলোর একটিতে একটি মৃত ইঁদুর পাওয়া গেলে তাঁর মনে সন্দেহ জাগে যে, হয়তো তেল মাড়াইয়ের কারখানায় ইঁদুরটি পড়েছিল এবং পুরো তেলই অপবিত্র হয়ে গেছে।

এই সন্দেহে তিনি সম্পূর্ণ তেল মাটিতে ফেলে দেন—যাতে কোনো মুসলমানের কাছে সন্দেহযুক্ত পণ্য বিক্রি না হয়। পরে এই বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল, তবুও তিনি নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। (আল-ইসফাহানি, হিলইয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া, ২/২৬৪, দারুল কিতাবিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৫)তাঁরা নবীজির সেই কঠিন সতর্কবাণীকে সর্বদা স্মরণ রাখতেন, যেখানে বলা হয়েছে, ‘যে শরীর হারাম (খাদ্য) দ্বারা পুষ্ট হয়েছে, দোজখের আগুনই তার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী।

’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৬১৪).ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবদুর রহমান আওজায়ি (রহ.)-এর মধ্যে নামাজে প্রতি তাকবিরে দুই হাত তোলাসহ বহু মাসআলায় মতভেদ ছিল। মক্কায় প্রকাশ্য বিতর্কও হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁদের অন্তরে একে অপরের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ছিল।

.তাবেয়িদের চরিত্রের সবচেয়ে সুন্দর দিকটি ছিল তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিনয়। তাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবিদের পিতার মতো সম্মান করতেন এবং নিজেদের মধ্যে মতানৈক্য হলেও কখনো শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘন করতেন না। ইমামদের মাঝে ফিকহি মতভেদ থাকলেও তাঁদের অন্তর ছিল একে অপরের প্রতি নিখাদ ভালোবাসায় পরিপূর্ণ।

তাবেয়ি আমির আশ-শাবি (রহ.) একবার সাহাবি ইবনে সাবিতের সম্মানে তাঁর বাহনের পাদানি ধরে রাখেন। আয়েশা (রা.) সম্পর্কে বর্ণনা করার সময় তাবেয়ি মাসরুক (রহ.) সবসময় বলতেন, ‘আমাকে হাদিস বর্ণনা করেছেন সিদ্দিকা বিনতুস সিদ্দিক, আল্লাহ যাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন এবং যিনি আল্লাহর প্রিয়ভাজন। ’ (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম আবদুর রহমান আওজায়ি (রহ.)-এর মধ্যে নামাজে প্রতি তাকবিরে দুই হাত তোলাসহ বহু মাসআলায় মতভেদ ছিল।

বিতর্কের পর আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারককে ইমাম আওজায়ি (রহ.) বলেছিলেন, ‘আমি এই কুফাবাসী ব্যক্তির (আবু হানিফার) গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়েছি, তাঁর ব্যাপারে আমার কাছে যা বলা হয়েছিল তিনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ’ইমাম আবু হানিফার ইন্তেকালের পর তিনি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘আজ ইলমের একটি বিরাট স্তম্ভ ধ্বংস হয়ে গেল। ’ (ইবনে আবদিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলম ওয়া ফাদলিহি, ২/১০৭৯, দারু ইবনিল জাওজি, দাম্মাম, ১৯৯৪)তাবেয়িদের জীবনযাপন আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীতে ক্ষমতার চূড়ায় বসে বা সম্পদের প্রাচুর্যের মাঝে থেকেও কীভাবে হৃদয়কে শুধু আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখা যায়।

তাঁরা ছিলেন সাহাবিদের রেখে যাওয়া সুন্নতর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি, যাঁদের তাকওয়া, ইলম ও সততার ওপর ভিত্তি করেই আজকের ইসলামি সভ্যতার ইমারত দাঁড়িয়ে আছে। .মহান তাবেয়ি সাইদ ইবনে জুবাইর।

সূত্র: প্রথম আলো

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

ইসরায়েল ৯০

ইসরায়েল builds 90km network of military roads across southern Lebanon

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

কীভাবে চলে মারিয়া–রমেশের সংসার

সড়কের পাশের একটি আমগাছে উঠে ডাল কাটছিলেন রমেশ বাস্কী। বাগানমালিকের কাছ থেকে আগেই অনুমতি নেওয়া ছিল। নিচে দাঁড়িয়ে সেই ডালগুলো কেটে এ...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

জেমসের নগরবাউলসহ ৭ ব্যান্ডের কনসার্ট চলছে

রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে জেমসের নগরবাউলসহ ৭ ব্যান্ডের কনসার্ট চলছে। কনসার্টটির আয়োজন করছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিস্তার...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

এইচএসসিতে ১০ লাখের বেশি উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের আবেদন, সময় আরও বেড়েছে

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না হওয়ায় পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়নের (খাতা চ্যালেঞ্জ) জন্য আবেদন করেছেন ২ ...

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV