জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আজই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুরে ট্রাইব্যুনাল সংলগ্ন নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে চিঠির খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেওয়া হবে যাতে করে দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আইনি কার্যক্রম ত্বরান্বিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালকে সাজা প্রদান করেছেন। আদালতের রায়ে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের নামে থাকা সমস্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এই বাজেয়াপ্তকৃত সম্পদ পরবর্তীতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন এবং যারা গুরুতর আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে বণ্টন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন মনে করে, এই পদক্ষেপটি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি প্রাথমিক ধাপ। রাষ্ট্রীয় এই উদ্যোগের মাধ্যমে অপরাধীদের অর্জিত সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহারের পথ প্রশস্ত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আপিল সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইন অনুযায়ী কোনো আসামির বিরুদ্ধে রায় প্রকাশিত হওয়ার পর তা চ্যালেঞ্জ করে আপিল করার জন্য ৩০ দিন সময় বরাদ্দ থাকে। শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের ক্ষেত্রে এই নির্ধারিত ৩০ দিনের সময়সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। যেহেতু তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতে কোনো আপিল দায়ের করেননি, সেহেতু তাদের সাজা এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার আদেশটি এখন চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে। আইনত এখন তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিতে আর কোনো বাধা অবশিষ্ট নেই। এই আইনি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটেই প্রসিকিউশন বিভাগ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে সম্পদ জব্দের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করার অনুরোধ জানাচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও জানান যে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে তার বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আদালতের রায়ে তাদের এই কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখন সেই রায়ের আলোকে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও ট্রাইব্যুনাল। চিঠিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হবে যেন তারা দ্রুত জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা এই দুই ব্যক্তির সম্পদের তালিকা তৈরি করে তা সরকারি হেফাজতে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
এই পদক্ষেপটি জুলাই বিপ্লবের চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্দোলনের সময় শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। তাদের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন যে, অপরাধীদের সম্পদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ শহীদ পরিবারের পুনর্বাসনে ব্যয় করা হলে তা হবে প্রকৃত ন্যায়বিচারের প্রতিফলন। তিনি আরও যোগ করেন যে, শুধু এই দুজনই নন, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পদের বিষয়েও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রসিকিউশন বিভাগ বর্তমানে সারা দেশে শেখ হাসিনা ও কামালের নামে থাকা বেনামি ও দৃশ্যমান সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করছে যাতে কোনো সম্পদই বাজেয়াপ্ত করার তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।
পরিশেষে, চিফ প্রসিকিউটর বলেন যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠি পাওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা এবং স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার নির্দেশ জারি করবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করা হবে যাতে কোনো আইনি ফাঁকফোকর না থাকে। জুলাই আন্দোলনের শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করা সম্ভব না হলেও, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর এই ক্ষুদ্র প্রয়াস বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে। প্রসিকিউশন বিভাগ আশা করছে যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই চিঠির গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!