বাংলাদেশে মাত্রাতিরিক্ত লবণ গ্রহণের স্বাস্থ্যঝুঁকি: বছরে ২৪ হাজার অকাল মৃত্যুর শঙ্কা

ভাতের থালা সামনে এলেই পাতে এক চিমটি কাঁচা লবণ ছিটিয়ে নেওয়ার অভ্যাস আমাদের দেশের জনসংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রান্নায় লবণের পরিমাণ সঠিক থাকলেও এই বাড়তি লবণ খাওয়ার প্রবণতা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি ক্রমবর্ধমান আসক্তি দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গাইডলাইন অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক লবণ গ্রহণের পরিমাণ ৫ গ্রামের কম হওয়া উচিত, যা মূলত এক চা-চামচেরও কম। অথচ বাংলাদেশে এই গ্রহণের গড় পরিমাণ ৯ গ্রাম ছাড়িয়ে প্রায় ৯.৭ গ্রামে পৌঁছেছে। এই অতিরিক্ত সোডিয়াম গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করছেন বলে বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সাম্প্রতিক এক সেমিনারে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে মৃত্যুর একটি বিশাল অংশের পেছনে দায়ী হলো অসংক্রামক ব্যাধি। এর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং কিডনিজনিত সমস্যা সবচেয়ে প্রকট। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত লবণ রক্তনালীর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা সরাসরি উচ্চ রক্তচাপের দিকে ধাবিত করে এবং পরবর্তীতে তা হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ২০১৭-১৮ সালের এক জরিপে ২৪ ঘণ্টার প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের মানুষ গড়ে দৈনিক যে পরিমাণ লবণ গ্রহণ করছে তা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের বোঝা আরও ভারী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবারের সহজলভ্যতা এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
লবণ কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের খাদ্যাভ্যাস এবং প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরতা। বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, নিমকি, সসেজ, নাগেটস এবং ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো খাবারে প্রচুর পরিমাণে লুকানো লবণ থাকে। এমনকি টিনজাত খাবার, লোনা ইলিশ, আচার, চাটনি এবং বিভিন্ন ধরনের সসেও লবণের মাত্রা থাকে অনেক বেশি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশের প্যাকেটজাত খাবারের ১০৫টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, প্রায় ৩৫.২ শতাংশ নমুনায় লবণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি। উদ্বেগের বিষয় হলো, ৪২ শতাংশ পণ্যের মোড়কে যে পরিমাণ লবণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি লবণ পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, সাধারণ মানুষ সচেতন হয়ে প্যাকেটের লেবেল দেখেও সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না, যা তাদের অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
লবণ নিয়ে আমাদের সমাজে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে যা স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। অনেকে মনে করেন কাঁচা লবণ ক্ষতিকর হলেও রান্না করা বা ভাজা লবণ শরীরের জন্য নিরাপদ। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, লবণ কাঁচা, রান্না করা কিংবা ভাজা যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন, তাতে সোডিয়ামের পরিমাণ একই থাকে এবং তা সমানভাবে ক্ষতিকর। আবার অনেকে সাধারণ লবণের পরিবর্তে রক সল্ট বা পিংক সল্টকে স্বাস্থ্যকর মনে করে ব্যবহার করেন। কিন্তু এগুলোতেও সোডিয়াম থাকে এবং দীর্ঘদিন আয়োডিনযুক্ত লবণের পরিবর্তে এগুলো ব্যবহার করলে শরীরে আয়োডিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই লবণ খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণ কমানোই হলো আসল সমাধান, লবণের ধরন পরিবর্তন নয়।
সুস্থ থাকতে হলে আমাদের খাদ্যাভ্যাসে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। লবণের বিকল্প হিসেবে খাবারের স্বাদ বাড়াতে লেবুর রস, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, পেঁয়াজ, রসুন এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে ঘরে তৈরি তাজা খাবার, যেমন—মুড়ি, চিড়া, খই, সেদ্ধ ছোলা এবং তাজা ফলমূল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একটি ধারণা কাজ করে যে, যেহেতু তারা এখন সুস্থ আছে, তাই বাড়তি লবণ খেলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগ হুট করে ধরা পড়ে না, এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফল। তাই রোগ হওয়ার পর সচেতন হওয়ার চেয়ে শুরু থেকেই পরিমিত লবণ ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।