সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল অংকের মানহানি মামলা খারিজ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একজন ফেডারেল বিচারক। আলোচিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের ৫০তম জন্মদিনের একটি বই এবং সেখানে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে পাঠানো একটি কথিত চিঠি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে এই আইনি লড়াই শুরু হয়েছিল। ফ্লোরিডার বিচারক ড্যারিন গেলস তার রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, ট্রাম্পের এই মামলাটি ছিল মূলত খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টার মতো এবং এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের নামান্তর। বিচারক এই মামলাটি ‘উইথ প্রেজুডিস’ বা চূড়ান্তভাবে খারিজ করেছেন, যার অর্থ হলো ট্রাম্প এই একই অভিযোগে ভবিষ্যতে আর কোনো মামলা করতে পারবেন না।
এই আইনি লড়াইয়ের মূলে ছিল ২০০৩ সালের একটি ঘটনা। সেই সময় জেফরি এপস্টাইনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি বিশেষ স্মারক বই তৈরি করা হয়েছিল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত বছর এক প্রতিবেদনে দাবি করে যে, সেই বইটিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, চিঠিতে ট্রাম্পের নাম ছিল এবং সেখানে একটি টাইপ করা বার্তার চারপাশে হাতে আঁকা একজন নগ্ন নারীর অবয়ব ছিল। চিঠিতে রহস্যময় কিছু মন্তব্য ছিল যেমন, ‘রহস্যের কোনো বয়স হয় না’ এবং শেষে লেখা ছিল, ‘একজন বন্ধু পাওয়া চমৎকার বিষয়। শুভ জন্মদিন—এবং প্রতিটি দিন যেন আরেকটি চমৎকার রহস্য হয়ে ওঠে’। ট্রাম্প শুরু থেকেই এই চিঠির অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছেন। তার দাবি ছিল, এই চিঠিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই সংবাদ প্রকাশ করেছে।
মামলাটি প্রথমে ২০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে দায়ের করা হয়েছিল। তবে বিচারক গেলস একবার এটি খারিজ করে দেওয়ার পর ট্রাম্পের আইনি দল ১০ বিলিয়ন ডলারের নতুন দাবি নিয়ে পুনরায় আবেদন করে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মূল প্রতিষ্ঠান ডাও জোন্স এবং এর প্রধান রুপার্ট মারডককে এই মামলায় বিবাদী করা হয়েছিল। ট্রাম্পের আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ট্রাম্প যখন ব্যক্তিগতভাবে এই চিঠির সত্যতা অস্বীকার করেছিলেন, তখন সংবাদপত্রের উচিত ছিল তাদের তদন্তের অন্য সব তথ্য উপেক্ষা করে সংবাদটি প্রকাশ না করা। তবে বিচারক এই যুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি তার ২০ পৃষ্ঠার রায়ে লিখেছেন যে, যদি কোনো পাবলিক ফিগার বা জননেতা কোনো অভিযোগ অস্বীকার করলেই সাংবাদিকরা সংবাদ প্রকাশে বাধাগ্রস্ত হন, তবে সেটি আমেরিকার বাকস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হবে।
মার্কিন আইনে মানহানি প্রমাণের জন্য ‘অ্যাকচুয়াল ম্যালিস’ বা প্রকৃত বিদ্বেষ প্রমাণের একটি উচ্চ মানদণ্ড রয়েছে। এর অর্থ হলো, বাদীর প্রমাণ করতে হবে যে বিবাদী জানতেন তথ্যটি মিথ্যা ছিল অথবা সত্যতা যাচাই না করেই বেপরোয়াভাবে তা প্রকাশ করেছেন। বিচারক গেলস তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এই সংবাদটি প্রকাশের আগে অত্যন্ত সতর্ক এবং বিস্তারিত তদন্ত চালিয়েছিল। ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এমন কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি যা দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে পত্রিকাটি বিদ্বেষবশত এই কাজ করেছে। বিচারক আরও উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্পের আইনি দল সংবাদপত্রের কাজের মধ্যে খুঁত খুঁজে বের করার জন্য অযথা চেষ্টা চালিয়েছে।
জেফরি এপস্টাইনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। ১৯৯৭ সালে মার-এ-লাগোতে তাদের একসঙ্গে তোলা ছবি এবং এপস্টাইনের নথিপত্র নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল। এপস্টাইন পরে যৌন অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হন এবং কারাগারে তার মৃত্যু হয়। ট্রাম্পের দাবি ছিল যে, এই প্রতিবেদনটি তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নষ্ট করার একটি ষড়যন্ত্র। তবে আদালতের এই রায়ের ফলে ট্রাম্পের সেই আইনি লড়াইয়ের পথ আপাতত বন্ধ হয়ে গেল। বিচারক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সাংবাদিকদের যে সুরক্ষা প্রদান করে, ট্রাম্পের এই মামলাটি সেই সুরক্ষার সীমা লঙ্ঘন করার চেষ্টা করেছিল।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!