যশোরে আয়োজিত ১১ দলীয় জোটের এক বিশাল পথসভায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, সংসদে আলোচনার মাধ্যমে যদি তাদের উত্থাপিত সাত দফা দাবির সমাধান করা না হয়, তবে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপান্তরিত হবে। শনিবার সন্ধ্যায় যশোরের মুড়লী মোড়ে আয়োজিত এই পথসভায় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও সারসংকট নিরসন এবং দেশব্যাপী দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধসহ সাতটি মৌলিক দাবিতে এই লংমার্চ ও পথসভার আয়োজন করা হয়। জামায়াত আমির তার বক্তব্যে বলেন, তারা সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে চান এবং চান যে সংসদেই এই সমস্যাগুলোর সমাধান হোক। বিশেষ করে জুলাই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যদি সরকার এই দাবিগুলো উপেক্ষা করে, তবে দেশের আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আবারও একটি গণবিপ্লবের ডাক দেওয়া হবে এবং তখন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের দায়ভার সরকারকেই নিতে হবে।
একই সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি সরকারের বিভিন্ন কার্ড কর্মসূচির তীব্র সমালোচনা করে বলেন যে, সরকার কৃষক কার্ড বা ফ্যামিলি কার্ডের মতো বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজেদের শক্তিশালী মনে করলেও জনগণের হাতে একটি শক্তিশালী কার্ড রয়েছে, যা হলো ‘লাল কার্ড’। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যদি এভাবে চলতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে সরকারকে সেই লাল কার্ড দেখাতে বাধ্য হবে। গোলাম পরওয়ার তার বক্তব্যে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রতিও একটি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, আজকের এই জনসমুদ্র এবং পথে পথে মানুষের স্লোগান বিএনপিকে একটি বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, নির্বাচনের আট মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও বিএনপির ভাববার সময় আছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এক সময় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং নিজেও ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু এখন সেই নিজের ভোটকেই অস্বীকার করা হচ্ছে। তিনি সরকারকে আহ্বান জানান যেন আগামী ৯ তারিখের সংসদ অধিবেশনে নিজেদের ভুল স্বীকার করে একদলীয় সংবিধান সংশোধনীর পথ থেকে সরে আসা হয় এবং রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সংসদে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা হয়।
যশোরে আয়োজিত এই পথসভাটি ছিল ১১ দলীয় জোটের দেশব্যাপী কর্মসূচির একটি অংশ। এর আগে মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, বাগেরহাট ও খুলনায় অনুরূপ পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। যশোরের মুড়লী মোড়ে দুপুর থেকেই জোটের হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক সমবেত হতে থাকেন এবং বিকেলের দিকে সেখানে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এবং এনসিপি নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। বক্তারা প্রত্যেকেই দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য সরকারের নীতিকে দায়ী করেন এবং অবিলম্বে সাত দফা দাবি বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। তারা বলেন, সারা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে এবং দেশ মেরামতের জন্য এখন জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কোনো বিকল্প নেই।
যশোরের কর্মসূচি শেষ করে ১১ দলের নেতারা ঝিনাইদহ শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন গোলচত্বরে আরেকটি পথসভায় অংশ নেন। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শফিকুর রহমান পুনরায় তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সরকার যদি গণভোটের রায় মেনে নেয়, তবে আর কোনো লংমার্চ হবে না। কিন্তু যদি জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করা হয়, তবে এই সাত দফা দাবি এক দফায় পরিণত হবে এবং তখন রাজধানী অভিমুখে লংমার্চ শুরু হবে। তিনি বিএনপি ও বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বলেন, গণভোটকে যদি অবৈধ বলা হয়, তবে বিএনপির সরকার এবং বর্তমান বিরোধী দলও অবৈধ হয়ে পড়বে। তিনি অভিযোগ করেন যে, যারা গণভোটের রায় মেনে নেয়নি তারা দেশের মানুষের সাথে ‘মুনাফেকি’ করেছে এবং এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাদের ভবিষ্যতে চরম মূল্য দিতে হবে। ঝিনাইদহের এই সভায় লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান, জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি হামিদুর রহমান আজাদসহ জোটের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রাত ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে জোটের নেতাকর্মীরা লংমার্চ নিয়ে কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!