ভারতের আসাম রাজ্যে ভুয়া ব্যাংক হিসাব বা মিউল অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সাইবার প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের ছয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই আর্থিক জালিয়াতি চক্রটির কার্যক্রমের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা বা পাকিস্তানি ইন্টেলিজেন্স অপারেটিভসের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন ভারতীয় গোয়েন্দারা। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং তেজপুরের গজরাজ মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের কাছ থেকে পাওয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এই বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হয় এবং এর মধ্য দিয়ে একটি বিস্তৃত আন্তঃরাজ্য প্রতারণা চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়।
পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এই পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় আসামের শোণিতপুর জেলায়। শোণিতপুর জেলা পুলিশ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ও মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের সতর্কবার্তা পাওয়ার পর একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করে। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় তদন্তভার দ্রুত এসটিএফের হাতে হস্তান্তর করা হয়। এসটিএফ কর্মকর্তারা তদন্তে নেমে প্রথমে গুয়াহাটির বাসিন্দা মারজিনা বেগম নামের এক নারীর স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পান। তদন্তে দেখা যায়, গত ২২ জুন থেকে ৫ আগস্টের মধ্যকার সময়ে ওই ব্যাংক হিসাবে বিভিন্ন উৎস থেকে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা জমা হয়েছে। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, টাকা জমা পড়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা বিভিন্ন উপায়ে অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে নেওয়া হয়, যা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে অ্যাকাউন্টটি কেবল অবৈধ অর্থ দ্রুত স্থানান্তরের মাধ্যম বা মিউল অ্যাকাউন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
আর্থিক এই লেনদেনের সূত্র ধরে তদন্তকারী কর্মকর্তারা গুয়াহাটির বামুনিময়দান এলাকার দুই যুবক—২২ বছর বয়সী মফিজুল হক এবং ১৯ বছর বয়সী হিমাংশু দাসের সন্ধান পান। গত ২৮ অক্টোবর বিশেষ অভিযান চালিয়ে মারজিনা বেগম, মফিজুল হক ও হিমাংশু দাসকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। তাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী দিনগুলোতে গুয়াহাটির বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। অভিযানের ধারাবাহিকতায় ২৯ অক্টোবর গণেশ নগর এলাকা থেকে রাকিব হুসেন নামে ৩৪ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এর পরদিন, অর্থাৎ ৩০ অক্টোবর উজানবাজার থেকে ২৫ বছর বয়সী ইফতেখার হুসেন এবং আনন্দ নগর এলাকা থেকে ২০ বছর বয়সী আরমান আজিজ হককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই সফল অভিযানে এসটিএফকে পূর্ণ সহায়তা দেয় গুয়াহাটি সিটি পুলিশ।
অভিযান চলাকালে আসাম পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের হেফাজত থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণাদি জব্দ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বহুসংখ্যক মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট, বিভিন্ন ব্যাংকের পাসবই, এটিএম বা ডেবিট কার্ড এবং অন্যান্য সন্দেহজনক নথিপত্র। উদ্ধার হওয়া এসব ডিজিটাল ডিভাইস ও নথিপত্র এখন বিশেষজ্ঞদের দ্বারা ফরেনসিক পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই চক্রটি গত প্রায় দুই বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের জাল বিস্তার করে আসছিল। অনলাইনে বিভিন্ন ফাঁদ পেতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ একাধিক সাধারণ নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করিয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে দেওয়া হতো। গোয়েন্দাদের ধারণা, সামগ্রিকভাবে এই চক্রের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার অবৈধ আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যার প্রকৃত আর্থিক পরিমাণ নির্ধারণের কাজ এখনো চলছে।
এসটিএফ কর্মকর্তাদের সন্দেহ, আসামে পরিচালিত এই চক্রটির মূল হোতা বা মাস্টারমাইন্ড রাজ্যের বাইরে অবস্থান করছে এবং সেখান থেকেই পুরো নেটওয়ার্কটি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। বাইরে বসে থাকা সেই মূল সমন্বয়কের নির্দেশেই আসামের সদস্যরা ভুয়া বা ভাড়া করা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং দ্রুত নগদ টাকা তোলার কাজ করত। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে চক্রটির সাথে পাকিস্তানের গোয়েন্দা চক্রের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা। তদন্তকারী সংস্থাগুলো খতিয়ে দেখছে যে, সাইবার জালিয়াতির মাধ্যমে উপার্জিত এই অর্থ কোনো দেশবিরোধী কার্যকলাপ, গোয়েন্দাগিরি কিংবা সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নে ব্যবহার করা হচ্ছিল কি না। এসটিএফ জানিয়েছে, এই চক্রের শিকড় আরও কত দূর বিস্তৃত তা উন্মোচন করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং সামনে আরও গ্রেফতারের সম্ভাবনা রয়েছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!