জাতীয় দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার কপি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. সাইফুর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানের এমন কর্মকাণ্ডকে অনভিপ্রেত উল্লেখ করে তাকে দ্রুত ওই পদ থেকে অপসারণের দাবি তুলেছেন তিনি। গত শনিবার রাতে রাশেদ খান নিজের ফেসবুক লাইভে এসে পত্রিকাটির কপি ছিঁড়ে ফেলেন, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান মনে করেন, একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত কোনো সংবাদের প্রতিবাদ জানানোর যে নির্দিষ্ট আইনি ও নৈতিক নিয়ম রয়েছে, তা রাশেদ খান জানেন না। আর এই নূন্যতম জ্ঞান না থাকা কোনো ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থাকা সমীচীন নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান তার কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন। তিনি লিখেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সেক্রেটারি রাশেদ খান আমার দেশ পত্রিকা ছিঁড়েছেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন যে, এমন আচরণের ফলে আমার দেশ পত্রিকার পাঠকরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাশেদ খানের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারেন। পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রীকে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সাইফুর রহমানের মতে, রাশেদ খানকে এই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তিনি আরও যোগ করেন যে, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কীভাবে গঠনমূলক প্রতিবাদ করতে হয়, সেই সাধারণ শিষ্টাচার যার জানা নেই, তাকে দ্রুত মেন্টাল হাসপাতালে পাঠানো উচিত। তার এই মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং অনেকেই তার এই বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শনিবার রাতে, যখন রাশেদ খান তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে আসেন। লাইভ চলাকালীন তিনি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার একটি কপি হাতে নিয়ে তা ছিঁড়ে ফেলেন। রাশেদ খানের অভিযোগ ছিল যে, পত্রিকাটিতে তাকে নিয়ে দুটি পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে যা সম্পূর্ণ অসত্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, এই প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার এবং তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়েই তিনি জনসমক্ষে পত্রিকার কপিটি ছিঁড়ে ফেলেন। তবে এই ঘটনাটি সাধারণ পাঠক এবং সাংবাদিক সমাজের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতার প্রতি এটি একটি চরম অবমাননা হিসেবে দেখছেন অনেকে। কোনো সংবাদের সাথে দ্বিমত থাকলে তা খণ্ডন করার জন্য প্রেস কাউন্সিলে যাওয়া বা প্রতিবাদ লিপি পাঠানোর সুযোগ থাকলেও সরাসরি পত্রিকা ছেঁড়ার ঘটনাকে অসভ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশিষ্টজনেরা।
অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় আরও উল্লেখ করেন যে, একজন দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এমন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সহকারীর মতো পদগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সেখানে এমন ব্যক্তিদের থাকা উচিত যারা ধৈর্য এবং প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে পারেন। রাশেদ খানের এই আচরণ কেবল তার ব্যক্তিগত অপরিপক্বতাই প্রকাশ করে না, বরং এটি সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সাইফুর রহমানের এই পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইন অঙ্গনের ব্যক্তিরাও এই বিষয়ে তাদের মতামত প্রদান করছেন। অনেকেই বলছেন যে, সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার বা সংবাদপত্রের প্রতি এমন ঘৃণা প্রদর্শন করার সংস্কৃতি গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।
উল্লেখ্য যে, আমার দেশ পত্রিকা এবং এর প্রতিবেদনের বিষয়ে রাশেদ খানের যে অভিযোগ, তা নিয়ে আইনি পথে হাঁটার সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি সেই পথ পরিহার করে আবেগের বশবর্তী হয়ে যে কাজ করেছেন, তা এখন তার গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোও এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং সংবাদপত্রের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতারই বহিঃপ্রকাশ। অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমানের মতো একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর এই দাবি সরকারের উচ্চপর্যায়ে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সামগ্রিকভাবে, রাশেদ খানের এই কর্মকাণ্ড এবং তার প্রেক্ষিতে অ্যাডভোকেট সাইফুর রহমানের অপসারণের দাবি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম পরিস্থিতিতে একটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!