প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খানের প্রকাশ্যে দৈনিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দিনাজপুরের খানসামা মডেল প্রেসক্লাব। গত শনিবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে রাশেদ খান পত্রিকাটিতে প্রকাশিত তাঁর বিরুদ্ধে দুটি প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটান। এ সময় তিনি পত্রিকাটির কপি ছিঁড়ে ফেলার পাশাপাশি এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেন যা সাংবাদিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
রোববার বিকেলে এক যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে এই ঘটনার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানান খানসামা মডেল প্রেসক্লাবের সভাপতি মাসুদ রানা ও সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারীর মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল পদে আসীন থেকে প্রকাশ্যে একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ছিঁড়ে ফেলার দৃশ্য ভিডিও করে প্রচার করা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং অপেশাদার আচরণ। এই ধরনের কর্মকাণ্ড কেবল একটি সংবাদপত্রের প্রতি অবমাননা নয়, বরং এটি সামগ্রিক গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শনের শামিল। দায়িত্বশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে জাতি এ ধরনের অগণতান্ত্রিক আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশা করে না।
প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ তাঁদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করেন যে, কোনো সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদ বা প্রতিবেদন নিয়ে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আপত্তি থাকে, তবে তা নিরসনের জন্য দেশে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিবিধান রয়েছে। সংক্ষুব্ধ পক্ষ চাইলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে সেই সংবাদের প্রতিবাদলিপি পাঠাতে পারেন, যা ছাপানো সংবাদপত্রের নৈতিক দায়িত্ব। এছাড়া প্রেস কাউন্সিলের দ্বারস্থ হওয়া কিংবা প্রয়োজনে প্রচলিত আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ সবসময় উন্মুক্ত থাকে। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে জনসমক্ষে সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলা কিংবা সম্পাদকের ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া কোনোভাবেই দায়িত্বশীল প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে না। এটি মূলত ভিন্নমত দমনের একটি অপচেষ্টা হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।
বিবৃতিতে অতীতের বিভিন্ন তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলা, পত্রিকায় আগুন দেওয়া কিংবা সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে যা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এ ধরনের কর্মকাণ্ড গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। অতীতের সেই সব নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যক্তিদের গণমাধ্যমের প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কখনোই কাম্য নয়।
খানসামা মডেল প্রেসক্লাবের সংবাদকর্মীরা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে এই ধরনের উসকানিমূলক ও অবমাননাকর আচরণ থেকে বিরত থাকার জোর আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা মনে করেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন একটি সুস্থ ও সবল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কোনো প্রতিবেদনে ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে তা যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণের মাধ্যমেই মোকাবিলা করা উচিত। পেশাদারিত্বের বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের শারীরিক বা মৌখিক আক্রমণ সাংবাদিকতার পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে। পরিশেষে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আরও বেশি সহনশীল ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দ।
পুরো ঘটনাটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, বিষয়টির গতিপ্রকৃতি নীতিনির্ধারক ও সাধারণ পাঠকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ঘটনার সূত্রপাত থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এ সংক্রান্ত পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য ও অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা বজায় রেখে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করা হচ্ছে।
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!