জাহাজভাঙা শিল্পমালিকদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে এই খাতকে পরিবেশগতভাবে 'লাল' থেকে 'কমলা' শ্রেণিতে রূপান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে পরিবেশবিদ ও শ্রমিক অধিকার কর্মীরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপে তদারকি শিথিল হবে এবং দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়বে।
দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অথচ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরণের নীতিগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। দীর্ঘ দিন ধরে খাতটির মালিকপক্ষের জোরালো দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত এই শিল্পকে পরিবেশগতভাবে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ 'লাল' শ্রেণি থেকে নামিয়ে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ 'কমলা' শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়, যা দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চট্টগ্রাম উপকূলের সীতাকুণ্ড অঞ্চলজুড়ে গড়ে ওঠা এই ইয়ার্ডগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই পরিবেশ দূষণ ও শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, যেসব শিল্প কারখানা বা প্রকল্প পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে এবং দূষণের মাত্রা সর্বাধিক থাকে, সেগুলোকে 'লাল' শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পক্ষান্তরে, মাঝারি ধরনের ক্ষতিকর বা শোধনাগার রয়েছে এমন খাতগুলোকে 'কমলা' শ্রেণির আওতাভুক্ত করা হয়। জাহাজভাঙা শিল্পের ক্ষেত্রে অতীতে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য, ভারী ধাতু, অ্যাসবেস্টস এবং তেলসমৃদ্ধ পদার্থের কারণে এটিকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক 'লাল' শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল। নতুন এই পরিবর্তনের ফলে ইয়ার্ডগুলোর জন্য পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া যেমন সহজ হবে, তেমনি বিভিন্ন ধরনের তদারকি ও আইনি বাধ্যবাধকতা অনেকাংশে শিথিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্পের মালিকপক্ষ ও উদ্যোক্তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে দাবি করছেন যে, গত কয়েক বছরে অনেক ইয়ার্ড আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিজেদের আধুনিকায়ন করেছে এবং হংকং কনভেনশনের শর্ত পূরণে কাজ করছে। তাদের মতে, 'লাল' শ্রেণিতে থাকার কারণে অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার শিকার হচ্ছিল এই খাত। অন্যদিকে, দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবাদী সংগঠন ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষকরা তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতির কোনো রকম দৃশ্যমান উন্নতি ছাড়াই কেবল বাণিজ্যিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক এবং এটি আন্তর্জাতিক পরিবেশগত চুক্তিরও পরিপন্থী হতে পারে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের ইস্পাত খাতের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহের অন্যতম উৎস এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এখানে জড়িত। তবে এই অর্থনৈতিক অর্জনের পেছনে পরিবেশের যে অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, ভূগর্ভস্থ পানি এবং সমুদ্রের ইকোসিস্টেমকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তনের কারণে তদারকি সংস্থার নজরদারি যদি আরও ঢিলেঢালা হয়, তবে ইয়ার্ডগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। অতীতে বিভিন্ন সময় ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহতের ঘটনা ঘটলেও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে, যা 'কমলা' শ্রেণিতে রূপান্তরের পর আরও উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে সুশীল সমাজ এবং পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের কাছে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার জোর দাবি জানিয়েছে। তাদের পরামর্শ হলো, শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তনের পূর্বে প্রতিটি ইয়ার্ডে বাধ্যতামূলকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট, গ্রিন সার্টিফিকেশন এবং কঠোর শ্রম আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা উচিত। অন্যথায়, শুধু কিছু ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সামগ্রিক পরিবেশগত নিরাপত্তা জলাঞ্জলি দিলে তা জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিপর্যয় ডেকে আনবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে যে, শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তন করা হলেও পরিবেশগত মনিটরিং বা তদারকি কার্যক্রম কোনোভাবেই কমানো হবে না, বরং তা আরও জোরদার করা হবে।
২৪টিভি লাইভ-এর সম্পাদকীয় পর্যালোচনায় মনে করা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষা—উভয়ের মাঝেই একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখা জরুরি। জাহাজভাঙা খাত দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করলেও, পরিবেশ ধ্বংসের মূল্যে কোনো উন্নয়নই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। সরকারের উচিত এই নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে একটি কঠোর স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা, যারা প্রতিটি ইয়ার্ডের প্রকৃত পরিবেশগত ও নিরাপত্তা সক্ষমতা যাচাই করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েই কেবল এ ধরনের শিল্প নীতি প্রণয়ন করা উচিত বলে আমরা বিশ্বাস করি।