সমাজে শান্তি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। খুলনায় এক সুধী সমাবেশে তিনি জনগণের আস্থা অর্জনে একটি জনবান্ধব ও কার্যকর পুলিশ বাহিনী গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমান পুলিশ প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি খুলনায় আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সুধী সমাবেশে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির সমাজের শিকড় গেড়ে বসা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ বা অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার সংস্কৃতি বরদাশত করা হবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখাই বর্তমান পুলিশ বাহিনীর প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ছোট-বড় ব্যবসায়ী—সবাই কমবেশি এই অপরাধ চক্রের শিকার হচ্ছেন। স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে শক্তি প্রদর্শন করে ত্রাস সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে আইজিপির এই ঘোষণা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। অপরাধের এই শেকড় দুর্বল না করলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের যুবসমাজ ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন।
আইজিপি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, শুধুমাত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ দমন সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন জনসচেতনতা এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা। সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট দূর করে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে একটি আস্থার সেতু বন্ধন তৈরি করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, পুলিশকে হতে হবে জনগণের প্রকৃত বন্ধু, যারা বিপদে সবার আগে আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়াবে। পাশাপাশি, পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে বলেও তিনি সংশ্লিষ্টদের আশ্বস্ত করেন।
চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো সামাজিক ব্যাধিগুলোর কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং সামাজিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার চাপে দিশাহারা হয়ে পড়ছেন, যা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অন্তরায়। অন্যদিকে, বিপথগামী কিশোরদের অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়া আগামী দিনের জাতির জন্য একটি বড় অশনিসংকেত। এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্য পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ধারাবাহিক অভিযান অব্যাহত থাকলে অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
২৪টিভি লাইভ-এর সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে মনে করা হয়, আইজিপির এই ঘোষণা কেবল একটি কথার কথা নয়, বরং এর বাস্তব রূপায়ন দেখতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে দেশবাসী। অতীতেও নানা সময় এমন ঘোষণা শোনা গেলেও মাঠপর্যায়ে তার সফল বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে। এবার রাজনৈতিক প্রভাব ও সব ধরনের বলয় ভেঙে অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তবেই সমাজে প্রকৃত শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি অপরাধমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে।