খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলায় স্থানীয় বিভিন্ন দলের ডাকা হঠাৎ সড়ক অবরোধের কারণে দূরপাল্লার যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি পাহাড়ি জনপদে এক থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই গুরুত্বপূর্ণ জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পূর্বঘোষিত সড়ক অবরোধের প্রভাবে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। গত বুধবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধের ফলে পাহাড়ি জনপদের অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোর পাশাপাশি জেলাগুলোর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও পিচঢালা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে এবং গাছের গুঁড়ি ফেলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন অবরোধকারীরা। এই আকস্মিক পরিস্থিতির কারণে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও অভ্যন্তরীণ রুটের ছোট যানবাহনগুলো টার্মিনালেই আটকে আছে। ফলে পণ্য সরবরাহ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক দাবির প্রেক্ষিতে এই অবরোধ কর্মসূচি আহ্বান করা হয়। গত কয়েক দিন ধরে পাহাড়ি অঞ্চলে চলা নানা অস্থিরতা এবং অমীমাংসিত কিছু ইস্যুর জেরে এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। অবরোধের শুরু থেকেই শহরের প্রধান সড়কগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির মূল প্রবেশদ্বারগুলোতে পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনী যৌথভাবে টহল জোরদার করেছে যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা সহিংসতা এড়ানো যায়। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সহিংসতার খবর পাওয়া না গেলেও সাধারণ মানুষের মনে এক ধরণের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম। অনেক ব্যবসায়ী দোকানপাট খোলার সাহস করেননি, যার ফলে বাজারগুলোতে এক ধরণের স্থবিরতা নেমে এসেছে।
অবরোধের কারণে সাধারণ দিনমজুর, শ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালানো মানুষেরা কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অপরদিকে, দূরদূরান্ত থেকে আসা যাত্রীরা বাস টার্মিনাল এবং সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে আটকা পড়ে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। বিশেষ করে রোগী ও তাদের স্বজনেরা অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি যানবাহনে যাতায়াত করতে গিয়ে মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ধরনের অবরোধের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, বলপ্রয়োগ বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসে শান্তিপূর্ণ উপায়ে রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণে এই ধরণের অবরোধ শান্তি প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে। পাহাড়ের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য সব পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সংলাপের বিকল্প নেই। অর্থনীতির ওপর এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। পর্যটন মৌসুমের প্রাক্কালে এ ধরনের অস্থিরতা পাহাড়ি অঞ্চলের অর্থনীতিকে বড় ধরণের ধাক্কা দিচ্ছে, যা স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন ব্যবসার সাথে জড়িত হাজার হাজার মানুষকে আর্থিক সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পাহাড়ের সার্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত যান চলাচল স্বাভাবিক করতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে। ২৪টিভি লাইভের সম্পাদকীয় পর্যবেক্ষণে মনে করা হয়, পাহাড়ি অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সংকট উত্তরণে কেবল প্রশাসনিক কঠোরতা নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আশা করা হচ্ছে, দায়িত্বশীল মহলের হস্তক্ষেপে খুব দ্রুতই এই অচলাবস্থার অবসান ঘটবে এবং পার্বত্য জনপদে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও শান্তি ফিরে আসবে।