ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের দীর্ঘকালীন সামরিক অভিযান এবং সেখানে সৃষ্ট নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয় বিশ্ববাসীর রাজনৈতিক চিন্তা, মানবাধিকারবোধ এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে এক বিশাল ও স্থায়ী পরিবর্তন এনেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রখ্যাত মার্কিন সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা অ্যাবি মার্টিন। তার মতে, গাজায় যা ঘটেছে এবং বর্তমানে যা ঘটছে, এরপর বিশ্ব আর কখনোই আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে না। সম্প্রতি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে মার্কিন র্যাপার ম্যাকলমোরের ফিলিস্তিনপন্থি সংগীত সফরের সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে অ্যাবি মার্টিন গাজাকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান নৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি মনে করেন, গাজার এই সংকট কেবল একটি আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এটি বিশ্ববিবেকের এক চরম পরীক্ষা যা প্রতিটি ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের প্রকৃত অবস্থানকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করে দিয়েছে।
অ্যাবি মার্টিন তার বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, গাজা বিশ্বকে বদলে দিয়েছে এবং আমাদের প্রত্যেককে নতুনভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেন, এই লড়াই শুরু হওয়ার আগে পৃথিবী যেমন ছিল, আর কখনো সেখানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুধু ফিলিস্তিনিদের ওপর বছরের পর বছর ধরে চলা নিপীড়নের চিত্রই নতুন করে সামনে আনেনি, বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মূলধারার গণমাধ্যম, মানবাধিকারের সংজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক বড় ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় তৈরি করেছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘকাল ধরে মানবাধিকার, গণতন্ত্র এবং ন্যায়বিচারের কথা বলে বিশ্ব শাসন করে আসছে, সেই পশ্চিমা দেশগুলোর দ্বিমুখী অবস্থান এখন সাধারণ মানুষের কাছে পুরোপুরি উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। এই উন্মোচন বিশ্ববাসীর মধ্যে এক নতুন রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দিয়েছে যা প্রচলিত ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে অ্যাবি মার্টিন বলেন যে, গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে আর নীরব থাকার কোনো সুযোগ নেই। তিনি মনে করেন, এখন সময় এসেছে প্রত্যেককে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার। হয় তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবেন, না হয় তারা বিদ্যমান নিপীড়নমূলক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে পরোক্ষ ভূমিকা রাখবেন। শিল্পীদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সৃজনশীল মানুষদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কি তাদের কাজের মাধ্যমে মানুষকে নিস্তেজ বা উদাসীন করে রাখবেন, নাকি পরিবর্তনের পক্ষে দাঁড়িয়ে জনমত গঠন করবেন। তিনি সংস্কৃতি ও শিল্পকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানান। মার্টিনের মতে, শিল্প যখন সত্যের পক্ষে কথা বলে, তখন তা প্রচলিত রাজনৈতিক বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারে।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রশ্নটিকে অ্যাবি মার্টিন একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের মুক্তি বিশ্বের সকল নিপীড়িত মানুষের আধিপত্য, শোষণ এবং সত্য বিকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই থেকে কোনোভাবেই আলাদা নয়। অর্থাৎ, ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে তিনি বৃহত্তর বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেন। তার মতে, যতক্ষণ ফিলিস্তিন পরাধীন থাকবে, ততক্ষণ বিশ্বের কোনো প্রান্তের মানুষের মুক্তিই পূর্ণতা পাবে না। পশ্চিমা দেশগুলোতে বর্তমানে ফিলিস্তিনের পক্ষে যে সাংস্কৃতিক বয়কট এবং সংহতি আন্দোলন গড়ে উঠেছে, সেটিরও প্রশংসা করেন তিনি। তিনি মনে করেন, এই ধরনের তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোগগুলো প্রচলিত গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক প্রচারণার বাইরে গিয়ে বিকল্প জনমত গঠনে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
অ্যাবি মার্টিন দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের একজন কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তার নির্মিত বিখ্যাত প্রামাণ্যচিত্র ‘গাজা ফাইটস ফর ফ্রিডম’-এ তিনি ফিলিস্তিনিদের মানবেতর জীবনযাপন, দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং তাদের অদম্য প্রতিরোধের চিত্র অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেছেন। এর আগেও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে, ফিলিস্তিনের প্রশ্নটি এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন বা আঞ্চলিক ইস্যু নয়; বরং এটি সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত মুক্তির প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে এসেছে। প্যারিসের ওই অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আবারও এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার লড়াইকে তিনি কেবল একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক অধিকারের বিষয় হিসেবে দেখছেন না, বরং একে বিশ্বজুড়ে মানবিক মর্যাদা ও মানুষের সামগ্রিক মুক্তির এক বৃহত্তর সংগ্রাম হিসেবে বিবেচনা করছেন। গাজাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে অভূতপূর্ব সংহতি তৈরি হয়েছে, তা নিপীড়নের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থানের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।




এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মতামত দিয়ে প্রথম হোন!