হাইতিতে গ্যাং নেতাকে হত্যার দাবি, প্রধানমন্ত্রীর উচ্ছ্বাস

হাইতির প্রধানমন্ত্রী অ্যালিক্স দিদিয়ার ফিলস-এইমে। ছবি: রয়টার্সহাইতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কুখ্যাত একটি অপরাধী চক্রের নেতা মাথিয়াস সেইনটিল নিহত হয়েছেন।
হাইতির প্রধানমন্ত্রী অ্যালিক্স দিদিয়ার ফিলস-এইমে। ছবি: রয়টার্সহাইতিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কুখ্যাত একটি অপরাধী চক্রের নেতা মাথিয়াস সেইনটিল নিহত হয়েছেন। দেশটির জাতীয় পুলিশ বাহিনী (পিএনএইচ) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক এক অভিযানে তাকে ‘হত্যা’ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যালিক্স দিদিয়ার ফিলস-এইমে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘আরেকজন গ্যাং নেতা কমল। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে পুলিশ জানায়, মাথিয়াস সেইনটিল রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের দরিদ্র এলাকা সিতে সোলেইয়ের বোস্টন গ্যাংয়ের নেতা ছিলেন।
ওই এলাকার নাম অনুসারেই অপরাধী চক্রটির নামকরণ করা হয়েছে। পুলিশের অভিযানে মাথিয়াস সেইনটিলের শরীরে একাধিক গুলি লাগে বলে জানা গেছে। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয় বলে পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী অ্যালিক্স দিদিয়ার ফিলস-এইমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই অভিযানের খবর উদ্যাপন করেন। ফরাসি ও হাইতিয়ান ক্রেওল ভাষার মিশ্রণে তিনি লেখেন, ‘আরেকজন গ্যাং নেতা কমল। দস্যুদের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করার লড়াই দৃঢ় সংকল্পে অব্যাহত থাকবে।
গ্যাং সদস্যরা আর শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। প্রেসিডেন্ট হত্যার পর ভয়াবহ সংকট। হাইতিতে কয়েক বছর ধরেই অপরাধী চক্রগুলোর সহিংসতা বেড়ে চলেছে।
২০২১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মইজকে হত্যার পর পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটে। প্রেসিডেন্ট হত্যার ঘটনা দেশটিকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। এরপর থেকে সেখানে কোনো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়াতে থাকে। একপর্যায়ে তারা দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন গ্যাংগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সমুদ্রবন্দরও তাদের দখলে রয়েছে। রাজধানী ও এর আশপাশে অন্তত ২৬টি অপরাধী চক্র সক্রিয়। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অবনতি এবং একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়ছে হাইতি।
পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ হিসেবে বিবেচিত হয় দেশটি। অপরাধী চক্রগুলো প্রায়ই খাবার, অর্থ উপার্জন এবং নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তরুণদের দলে ভেড়ায়। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, হাইতিতে গ্যাং সদস্যদের অর্ধেকই ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু ও কিশোর।
বাস্তুচ্যুত ১৪ লাখের বেশি মানুষ। গ্যাংগুলোর সহিংসতায় দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সহিংসতার কারণে অন্তত ১৪ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত হাইতিতে সহিংসতায় অন্তত ১ হাজার ১২৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৪৪০ জন। যৌন সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে গ্যাং-সংশ্লিষ্ট ধর্ষণের ৬৮৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। হাইতির নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত এপ্রিল মাসে নতুন আন্তর্জাতিক গ্যাং দমন বাহিনীর (জিএসএফ) সদস্যরা দেশটিতে পৌঁছাতে শুরু করেন।
গ্যাংগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা, বিচ্ছিন্ন করা এবং তাদের তৎপরতা ঠেকানোই এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য। বাহিনীটির ১২ মাসের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ গত সেপ্টেম্বরে নবায়ন করা হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত এর কার্যক্রমের অনুমোদন দিয়েছে।
তবে আগের কেনিয়ার নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক নিরাপত্তা সহায়তা বাহিনীর (এমএসএস) মতো নতুন বাহিনীটিও নানা সমস্যার মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত অর্থ ও জনবলের অভাব। জিএসএফের সমর্থকেরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাহিনীটির জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, হাইতির অপরাধী চক্রগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষে জিএসএফের সদস্যরাও হামলার শিকার হচ্ছেন। গত ১৮ অক্টোবর বাহিনীটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এল সালভাদরের চারজন বিমান চলাচলবিষয়ক কারিগরি কর্মী অপহৃত হন। এর জবাবে হাইতিতে সর্বোচ্চ ২ হাজার সেনা পাঠানোর উদ্যোগ নেয় এল সালভাদর।
দেশটির প্রেসিডেন্ট নায়েব বুকেলে এই সেনা মোতায়েনকে উদ্ধার অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেন। ২১ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন বুকেলে। এতে হাইতির রাস্তায় সাঁজোয়া যান টহল দিতে দেখা যায়।
কয়েকটি যান থেকে গুলিও ছোড়া হচ্ছিল। বুকেলে লেখেন, ‘আমাদের একটাই লক্ষ্য—আমাদের চার নাগরিককে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে আনা। গ্যাং নেতাদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে।
চার জিম্মিকে জীবিত অবস্থায় ফিরিয়ে না দিলে আজকের হামলা সামনে যা আসছে, তার তুলনায় কিছুই নয়। এরপর বুকেলে হাইতির জনগণকে নিজেদের সম্প্রদায় ও এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে জেগে ওঠার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তার দেশের সেনারা হাইতিতে ‘দখলদার’ হিসেবে যায়নি।
হাইতিতেও কঠোর অভিযানের হুঁশিয়ারি বুকেলের। এল সালভাদরে গ্যাং দমনে বুকেলের কঠোর পদক্ষেপের সমালোচনা করে আসছে মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো। অপরাধী চক্র দমনের নামে দেশটিতে ব্যাপক ধরপাকড় ও গণবিচারের আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার সরকারের বিরুদ্ধে।
বুকেলে সতর্ক করে বলেছেন, হাইতির গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধেও তিনি একই ধরনের কঠোর কৌশল প্রয়োগ করতে সক্ষম। শুক্রবারের সর্বশেষ এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে হাইতির একজন প্রভাবশালী গ্যাং নেতার বাড়ি শনাক্ত করার দাবি করা এক ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথন করেন তিনি। ওই ব্যক্তির কাছে বাড়িটির অবস্থান জানতে চান বুকেলে।
তিনি লেখেন, ‘বাড়িটি কোথায় অবস্থিত। আমাদের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা দিন, আমরা সেটি ধ্বংস করে দেব। হাইতিতে গ্যাং সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে দেশটির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরা।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল অর্থনীতি ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।





মতামত (০)
এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।