রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬ / ভোর ৪:০৪ঢাকা, বাংলাদেশ যোগাযোগ ↗
এইমাত্র
জাতীয়

সিলেটের ইতিহাসের স্মারক ক্বীন ব্রিজ

সিলেটের ইতিহাসের স্মারক ক্বীন ব্রিজ
সিলেটের ইতিহাসের স্মারক ক্বীন ব্রিজ

সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নগরজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সুরমা নদী। আর এই নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ক্বীন ব্রিজ শুধু একটি যোগাযোগ স্থাপনা নয়; এটি সিলেটের দীর্ঘ নগর ইতিহাস, ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশল দক্ষতা এবং পরিবর্তনশীল যোগাযোগব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।

সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নগরজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে সুরমা নদী। আর এই নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ক্বীন ব্রিজ শুধু একটি যোগাযোগ স্থাপনা নয়; এটি সিলেটের দীর্ঘ নগর ইতিহাস, ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশল দক্ষতা এবং পরিবর্তনশীল যোগাযোগব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর ওপর নির্মিত এই লোহার সেতু একসময় শহরের সঙ্গে নদীর দক্ষিণ তীরের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সময়ের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এলেও ক্বীন ব্রিজ আজও সিলেটের ঐতিহাসিক পরিচয়ের অন্যতম দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে টিকে আছে। ক্বীন ব্রিজ নির্মাণের মূল কারণ ছিল সিলেট শহর ও সুরমা নদীর দক্ষিণ তীরের মধ্যে যোগাযোগ সহজ করা। ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেট অঞ্চলে প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার প্রয়োজনও বাড়তে থাকে।

নদীপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থল যোগাযোগ আরো কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা থেকেই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৩ সালে তৎকালীন রেলওয়ে বিভাগ সুরমা নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। কয়েক বছরের নির্মাণকাজ শেষে ১৯৩৬ সালে সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

তৎকালীন আসামের গভর্নর মাইকেল ক্বীনের নাম অনুসারে সেতুটির নামকরণ করা হয় ‘ক্বীন ব্রিজ’। ব্রিটিশ আমলের এই স্থাপনার নামের মধ্যেও সে সময়কার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায় প্রতিফলিত হয়। লোহার কাঠামোয় ঔপনিবেশিক প্রকৌশলের ছাপ।

ক্বীন ব্রিজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এর লোহার তৈরি কাঠামো। সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ১৫০ ফুট এবং প্রস্থ প্রায় ১৮ ফুট। নদীর ওপর দীর্ঘ এই ধাতব কাঠামো নির্মাণে তৎকালীন প্রকৌশল প্রযুক্তির সক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়।

সেতুটির নকশা ও নির্মাণশৈলীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রকৌশল ঐতিহ্যের প্রভাব স্পষ্ট। বর্তমান সময়ে বড় বড় আধুনিক সেতু নির্মাণের প্রযুক্তি সহজলভ্য হলেও কয়েক দশক আগে নদীর ওপর এমন একটি দীর্ঘ লোহার সেতু নির্মাণ ছিল প্রকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। দীর্ঘ সময় যানবাহন ও পথচারীদের চলাচলের পাশাপাশি ক্বীন ব্রিজ সিলেটের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনেও ভূমিকা রেখেছে।

সেতুকে ঘিরে নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সিলেট শহরের বিস্তারে ভূমিকা রাখে। সিলেটের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো ক্বীন ব্রিজও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেতুটির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যুদ্ধের পর সেতুটি মেরামত করে আবার যোগাযোগব্যবস্থায় ব্যবহার করা হয়। ফলে ক্বীন ব্রিজ শুধু ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যের স্মারক নয়; বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও পরবর্তী পুনর্গঠনের ইতিহাসের সঙ্গেও এর যোগ রয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে সিলেটের যোগাযোগব্যবস্থাও।

সুরমা নদীর ওপর নতুন সেতু নির্মাণ এবং সড়ক যোগাযোগের বিস্তারের ফলে ক্বীন ব্রিজের ওপর আগের মতো নির্ভরতা নেই। তবু ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে সেতুটি সিলেটবাসীর কাছে বিশেষ মর্যাদা বহন করে। একদিকে এর লোহার কাঠামো ব্রিটিশ আমলের প্রকৌশল ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়, অন্যদিকে সেতুটিকে ঘিরে রয়েছে সিলেটের পুরোনো নগরজীবনের নানা স্মৃতি।

বহু প্রজন্মের মানুষের যাতায়াত, নদীকেন্দ্রিক জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার এবং নগরের পরিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্বীন ব্রিজ। ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ক্বীন ব্রিজের গুরুত্ব শুধু এর বয়সে নয়; সিলেটের সামাজিক, অর্থনৈতিক, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের সঙ্গে এর সম্পর্কও একে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এই নিদর্শন সংরক্ষণে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা জরুরি।

একই সঙ্গে পর্যটন ও ঐতিহ্যভিত্তিক নগর পরিকল্পনায় ক্বীন ব্রিজকে গুরুত্ব দেওয়া হলে এটি সিলেটের ইতিহাসনির্ভর পর্যটনেরও একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। সিলেটের পরিচয়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক ঐতিহাসিক স্থাপনা। সুরমার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ক্বীন ব্রিজ আজ শুধু একটি পুরোনো সেতু নয়।

এটি সিলেটের অতীত নগরজীবনের দৃশ্যমান স্মারক। ব্রিটিশ আমলের যোগাযোগ অবকাঠামো থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং আধুনিক সিলেটের বিকাশ—দীর্ঘ সময়ের নানা পরিবর্তনের সাক্ষী এই সেতু। আধুনিক নগরায়ণের চাপে যখন অনেক পুরোনো স্থাপনা হারিয়ে যাচ্ছে, তখন ক্বীন ব্রিজ সিলেটের ইতিহাসকে দৃশ্যমানভাবে ধরে রেখেছে।

তাই সুরমা নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই লোহার সেতু শুধু অতীতের একটি নির্মাণ নয়; এটি সিলেটের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নগরপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন।

সূত্র: আমার দেশ

মতামত (০)

এখনও কোনো মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। প্রথম মতামতটি আপনার হোক।

আরও পড়ুন

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

ফাঁদে পা না দিতে বাংলাদেশিদের সতর্ক করলো মিশর দূতাবাস

মিশরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতারণার ফাঁদে না পড়তে সতর্ক করেছে কায়রোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। দূতাবাসের নাম ও পরিচয় ...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত ৬, হামলাকারী ‘কট্টর ডানপন্থী’ মতাদর্শের

পোল্যান্ডের ক্রাকো শহরে একটি উন্মুক্ত চত্বরে গুলির ঘটনায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছে। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে চারজন নারী ও ...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

৭ নভেম্বরের চেতনায় মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাের আহ্বান

প্রবাসে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতীয় চেতনাকে ধারণ করে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মিশরে পালিত হয়েছে জাতীয় বিপ্লব ও...

24TV.Live ব্যানার
জাতীয়

মধ্যরাতে রাজধানীর মহাখালীতে বাসে আগুন

ছবি: সংগৃহীতরাজধানীর মহাখালী টার্মিনালে পার্কিং করে রাখা সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৭...

বিজ্ঞপ্তি

এটি 24TV.Live এর বেটা সংস্করণ। আপনার মতামত জানান।

মতামত দিন ↗
অ্যাপ ডাউনলোড Android Android TV